প্রকৃতি পরম গুরু-৩য় পর্ব

পূর্বের পর্বগুলোতে আমরা ধরিত্রী, বৃক্ষ ও পর্বত, শরীরের অভ্যন্তরে এবং বাহিরে অবস্থান করা বায়ু, আকাশ, জল, অগ্নি, চন্দ্র ও সূর্যের নিকট শিক্ষণীয় বিষয়সম্বন্ধে জেনেছি। এই পর্বে আমরা জানবো এক কপোত-কপোতী দম্পতির মাধ্যমে প্রকৃতি আমাদের কী শিক্ষা দিয়ে থাকে।


অবধূত দত্তাত্রেয় বললেন- "রাজন্ ! কোথাও কারো প্রতি অতি স্নেহ অথবা আসক্তি থাকা উচিত নয় কারণ তার ফলে তার বুদ্ধি স্বাতন্ত্র্য হারিয়ে দীন হয়ে পড়বে অর্থাৎ তাকে কপোতের ন্যায় অতি ক্লেশের সম্মুখীন হতে হবে।


রাজন্ ! কোনো এক জঙ্গলে এক কপোতের বাস ছিল। সে একটি গাছে নিজের বাসা বেঁধেছিল ; নিজ কপোতীর সঙ্গে সে বহু দিন পর্যন্ত সেই বাসায় রইল। সেই কপোত-কপোতীর হৃদয়ে পরস্পরের প্রতি স্নেহের উত্তরোত্তর বৃদ্ধি হতে থাকল। তারা গৃহস্থধর্মে এমনই আসক্ত হয়ে পড়ল যে পরস্পরের দৃষ্টি, অঙ্গ এবং ভাবনার দৃঢ় বন্ধনে লিপ্ত হয়ে গেল।

পরস্পরের উপর তাদের অগাধ বিশ্বাস। তাই তারা নিশ্চিন্ত মনে সেখানকার বৃক্ষশ্রেণীতে একত্রে শয়ন, বসন, বিচরণ, বিশ্রাম, কথোপকথন, ক্রীড়া এবং আহারাদি সম্পন্ন করত। কপোতীর উপর কপোতের প্রবল আসক্তি ছিল যার জন্য কপোতির কামনা পূর্ণ করবার জন্য সে অতি বড় কষ্টও হাসি মুখে সহ্য করত। সেই কপোতীও নিজ কামুক পতির কামনাসকল পূর্ণ করত। যথা সময়ে কপোতী গর্ভবতী হল। সে তার পতির আশ্রয়েই নিজের বাসাতে ডিম পাড়ল। ভগবানের অচিন্ত্য শক্তিতে যথাসময়ে সেই ডিম্বগুলি প্রস্ফুটন হল এবং তার ভিতর থেকে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গযুক্ত শাবকগণ নির্গত হল। শাবকদের অঙ্গ ও রোঁয়া অত্যন্ত কোমল ছিল। এবার কপোত-কপোতীর দৃষ্টি শাবকদের উপর নিবদ্ধ হল। তারা অতি প্রেম ও আনন্দ সহকারে নিজ শাবকদের লালন-পালনে অপত্য স্নেহ দান করতে লাগল এবং শাবকদের সুমিষ্ট ডাক শুনে আনন্দমগ্ন হয়ে যেতে লাগল। শাবকগণ তো সব সময়ে প্রসন্ন; তারা যখন তাদের সুকুমার পাখনা দিয়ে তাদের মা-বাবার স্পর্শ করত, কূজন করত, নিষ্পাপ আচরণে মগ্ন হত এবং লাফিয়ে মা-বাবার কাছে দৌড়ে আসত তখন কপোত-কপোতী আনন্দমগ্ন হয়ে যেত।


রাজন্! বস্তুত সেই কপোত-কপোতী ভগবানের মায়াতে মোহিত হয়ে পড়েছিল। তাদের হৃদয় আর এক স্নেহবন্ধনে যুক্ত হয়ে যাচ্ছিল। তারা তাদের শিশু শাবকদের লালন-পালনে এতই ব্যগ্র হয়ে উঠল যে তাদের জগতে ইহলোক পরলোকের বিস্মৃতি হতে লাগল। তারা দুজনেই একদিন শিশু শাবকদের জন্য খাদ্য সংগ্রহ হেতু জঙ্গলে গমন করেছিল। তাদের কুটুম্ব সংখ্যায় অত্যধিক বৃদ্ধি হেতু খাদ্যের অভাব হয়েছিল। তাই খাদ্য আহরণে অনেকক্ষণ পর্যন্ত জঙ্গলে চতুর্দিকে বিচরণ করে বেড়াতে থাকল। এদিকে এক ব্যাধ বিচরণ করতে করতে ভাগ্যের নির্দেশেই সেই পাখির বাসার কাছে উপস্থিত হল। সে দেখল যে বাসার কাছে কপোত শাবকগণ লাফালাফি করে বেড়াচ্ছে। সে জাল পেতে তাদের ধরে ফেলল। কপোত-কপোতী শাবকদের খাদ্য দানে সদা আগ্রহী থাকত। এবার তারা খাদ্য মুখে নিয়ে তাদের কাছে পৌঁছল। কপোতী দেখল যে তার হৃদয়ের অংশ শিশু শাবকগণ জালে আটকা পড়েছে ও আর্তনাদ করছে। তাদের এই পরিস্থিতিতে দেখতে পেয়ে কপোতীর দুঃখের সীমা থাকল না। সে বিলাপ করতে করতে শিশু শাবকদের দিকে ছুটে গেল। ভগবানের মায়ার প্রভাবে তার চিত্ত বিদারণ হচ্ছিল। উদ্দাম স্নেহের রজ্জুতে কপোতীর হৃদয় বাঁধা পড়ে ছিল। নিজ শাবকদের জালে বদ্ধ দেখে তার নিজের শরীরের বিস্মরণ হল এবং সে স্বয়ং কাছে গিয়ে জালে আবদ্ধ হয়ে পড়ল। যখন কপোত দেখল যে তার প্রাণাধিক প্রিয় শাবকগণ জালে বন্দী এবং তার প্রিয় ভার্যারও সেই একই দশা, তখন সে শোকে বিহ্বল হয়ে বিলাপ করতে লাগল। যথার্থরূপেই তার অবস্থা তখন অতি করুণ ছিল। আমি অভাগা, আমি দুর্মতি। হায় ! হায় ! আমার তো সর্বনাশ হয়ে গেল। দেখো, না আমার তৃপ্তি হল, না আমার আশা পূর্ণ হল। এমনকি আমার ধর্ম, অর্থ এবং কামের মূল এই গৃহস্থাশ্রমই নষ্ট হয়ে গেল৷ হায় ! আমার প্রিয়তমা আমাকে ইষ্ট জ্ঞানে সেবা করত, আমার মতানুসারে চলত, আমার অঙ্গুলি নির্দেশে কাজ করত। সে তো সম্পূর্ণভাবেই আমার উপযুক্ত ছিল। আজ সে আমাকে এই নির্জন গৃহে একলা রেখে আমাদের সহজ-সরল সন্তানদের সঙ্গে স্বর্গে গমন করছে। আমার সন্তানগণ মারা পড়ল। আমার প্রিয়তমাও চলে যাবার পথে। এই জগতে আমার আর কী কাজ বাকি আছে? আমার মতন দীনহীনের এই বিষাদাচ্ছন্ন জীবন, প্রিয়তমা ছাড়া জীবন দুঃখে পরিপূর্ণ। আর আমি কেমন করে এই নিঃসঙ্গ গৃহে জীবন-যাপন করব? রাজন্ ! কপোত শাবকগণ জালে বদ্ধ হয়ে ছটফট করছিল, স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল যে তারা মৃত্যুর কবলিত হয়েছে, কিন্তু তবুও সেই মূর্খ কপোত সব দেখে কাতর হয়ে পড়ল এবং স্বেচ্ছাপ্রণোদিত হয়ে জালে লাফিয়ে পড়ল। সেই ব্যাধ অতি নিষ্ঠুর প্রকৃতির ছিল। গৃহস্থাশ্রমী কপোত-কপোতী ও তাদের শাবকদের জালে ধরা দেখে সে খুব প্রসন্ন হল। সে ভাবল যে তার কাজ হাসিল হয়েছে এবং তাই সে তাদের নিয়ে চলে গেল।


যে পরিবার-পরিজনদের নিয়ে রয়েছে, বিষয়ভোগে ও স্ত্রী-সন্তানদের প্রতি প্রবল আকর্ষণ অনুভব করে এবং তাদের ভরণপোষণেই দিন-রাত ব্যস্ত থাকে, সে কখনো শান্তি পেতে পারে না। সে ওই কপোতবৎ নিজ কুটুম্ব-সহ কষ্ট ভোগ করে থাকে। এই মানব-শরীর বস্তুত মুক্তির উন্মুক্ত দ্বার। মানব-শরীর লাভ করেও যে কপোতবৎ নিজ ঘরগৃহস্থালিতেই আবদ্ধ থাকে সে অনেক উচ্চে আরোহণ করেও নিম্নগামী হচ্ছে। শাস্ত্রের ভাষায় সে ‘আরূঢ়চ্যুত’॥"


তৃতীয় পর্ব এখানেই শেষ করছি। পরবর্তী পর্ব শীঘ্রই আসছে। শেষ পর্যন্ত যারা পড়েছেন তাদেরকে অসংখ্য ধন্যবাদ।


তথ্যসূত্র:-শ্রীমদ্ভাগবত পুরাণ


✍️:অর্ক বিশ্বাস 

গবেষক, সনাতন শাস্ত্র গবেষণা কমিটি

।ॐ।সত্যের সন্ধানে সনাতন।ॐ।


পরবর্তী পর্ব দেখতে ক্লিক করুন

পূর্ববর্তী পর্ব দেখতে ক্লিক করুন

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নবীনতর পূর্বতন



ধর্মীয় বাণী/উপদেশ

"দেবী! তুমি স্বাহা, তুমি স্বধা এবং তুমিই বষটকার। স্বরও তোমারই স্বরূপ। তুমিই জীবনদায়িনী সুধা। নিত্য অক্ষর প্রণবের অকার, উকার, মকার-এই তিনমাত্রারূপে তুমিই স্থিত, আবার এই তিন মাত্রা ছাড়া বিন্দুরূপা যে নিত্য অর্দ্ধমাত্রা-যাকে বিশেষরূপে আলাদাভাবে উচ্চারণ করা যায় না, তাও তুমিই। " (শ্রী শ্রী চন্ডীঃ ১/৭৩-৭৪)