প্রকৃতি পরম গুরু-২য় পর্ব


পূর্বের পর্বে আমরা দেখেছি প্রকৃতির উপাদান ধরিত্রী, বৃক্ষ-পর্বত, শরীরের অভ্যন্তরে অবস্থান করা প্রাণবায়ু ও শরীরের বাইরে প্রবাহিত বায়ুর নিকট সাধক কী কী শিক্ষা গ্রহণ করতে পারে। এই পর্বে আমরা জানবো আকাশ, জল, অগ্নি, চন্দ্র ও সূর্যের নিকট শিক্ষণীয় বিষয় সম্বন্ধে।


অবধূত দত্তাত্রেয় বললেন,"রাজন! স্থাবর জঙ্গম ব্যতিরেকে ঘটে-পটে দৃশ্য পদার্থসকলের কারণ ভিন্ন ভিন্ন প্রতীত হলেও বস্তুত আকাশ এক, অখণ্ড, অপরিচ্ছিন্ন। তেমনভাবেই বিশ্ব চরাচরে অবস্থিত শরীর সমুদায়ের মধ্যে আত্মারূপে সর্বত্র স্থিত হওয়ায় ব্রহ্ম সকলের মধ্যেই বিদ্যমান। সাধকের পক্ষে কাম্য হল সে যেন সুতোর মধ্যে ব্যাপ্ত তুলাবৎ আত্মাকে অখণ্ড এবং অসঙ্গরূপে প্রত্যক্ষ করে। তার বিস্তৃতি এত বিশাল যে তার তুলনা সম্ভবত আকাশের সঙ্গেই করা যেতে পারে। অতএব সাধকের আত্মার ব্যাপকতার চিন্তা আকাশরূপে করাই বিধেয়। আগুন লাগে, বৃষ্টি হয়, অন্নাদির সৃষ্টি ও বিনাশ হয়, বায়ুর দ্বারা মেঘাদি আসে, চলে যায়; এই সব ঘটনার পরেও আকাশ কিন্তু অসংলগ্ন থেকেই যায়। আকাশের দৃষ্টিতে এই সকলের অস্তিত্বই নেই। তেমনভাবেই ভূত, বর্তমান এবং ভবিষ্যতের চক্রে অনন্ত নামরূপ সকলের সৃষ্টি ও প্রলয় হয় কিন্তু আত্মার সঙ্গে তার কোনো সংলগ্নতাই নেই।


জল স্বভাবতই স্বচ্ছ, স্নিগ্ধ, মধুর ও পবিত্রতা প্রদানকারী হয়ে থাকে এবং গঙ্গাদি তীর্থের দর্শন, স্পর্শন, নাম উচ্চারণেই সকলে পবিত্র হয়ে যায়। তেমনভাবেই সাধকেরও শুদ্ধ, স্নিগ্ধ, মধুরভাষী ও পবিত্রতা প্রদানকারী হওয়া কাম্য। জল থেকে শিক্ষাগ্রহণকারী ব্যক্তি নিজ দর্শন, স্পর্শন ও নাম-উচ্চারণের দ্বারাই সকলকে পবিত্র করে দেন।


রাজন! অগ্নিও আমার শিক্ষাগুরু। অগ্নি স্বয়ং তেজস্বী ও জ্যোতির্ময়, অন্যের তেজের কোনো প্রভাবই তাঁর উপর পড়ে না। তার সংগ্রহ-পরিগ্রহের হেতু কোনো পাত্রও নেই, সব কিছু উদরে ধারণ করে এবং সর্ব বস্তু গ্রহণ করার পরও সে গ্রহণীয় বস্তুসকলের দোষে লিপ্ত হয় না। তেমনভাবে সাধকের পক্ষেও কাম্য যে, সে যেন পরম তেজস্বী হয়, তপস্যায় দেদীপ্যমান হয়, ইন্দ্রিয় সমুদায় থেকে অপরাভূত হয়, শুধুমাত্র উদরপূর্তির জন্য আবশ্যক অন্নের সংগ্রহকারী এবং যথাযোগ্য বিষয়ের উপভোগ কালেও নিজ মন ও ইন্দ্রিয় নিচয়কে বশকারী হয় এবং অপরের দোষের প্রভাব থেকে নিজেকে মুক্ত রাখে। অগ্নি কোথাও (কাষ্ঠে) প্রকাশিত কোথাও অপ্রকাশিত।তেমনভাবে সাধকও প্রয়োজনে কোথাও গুপ্ত ও কোথাও প্রকাশিত হবে। তার এমন রূপেও প্রকাশিত হওয়া কাম্য যাতে কল্যাণকামনাকারী ব্যক্তি তার দ্বারা প্রভাবিত হয়। সে যেন অগ্নিবৎ ভিক্ষারূপ যজ্ঞকারীর অতীত এবং ভাবী অশুভকে ভস্মসাৎ করে দেয় এবং সাধারণ লোকেরও অন্নগ্রহণকারী হয়। সাধক ব্যক্তির এমনভাবে বিচার করা কাম্য যেমন ছোট-বড় বাঁকাচোরা কাষ্ঠে অগ্নি সংযোজিত হলে বাস্তবে সেইরূপ না হলেও অগ্নি সেইরূপে দেখা যায়। তেমনভাবেই সর্বব্যাপক আত্মাও মায়ার দ্বারা নির্মিত কার্য-কারণরূপ জগতে ব্যাপ্ত হওয়ার জন্য সেই সকল বস্তুর নাম-রূপের সঙ্গে সম্বন্ধ বিরহিত হলেও সেই রূপে অবস্থিত বোধ হয়।


চন্দ্রের কাছ থেকেও আমি শিক্ষা গ্রহণ করেছি। আমরা দেখি যে কালের প্রভাবে চন্দ্রকলার হ্রাসবৃদ্ধি হতেই থাকে তবুও আমরা জানি চন্দ্র তো চন্দ্রই; তার হ্রাসও হয় না, বৃদ্ধিও হয় না।তেমনভাবেই জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত যত অবস্থা আসতে দেখা যায় সব কিন্তু শরীরেরই, আত্মার সঙ্গে তার কোনো সম্বন্ধ নেই। অগ্নিশিখার অথবা দীপশিখার উৎপত্তি ও বিনাশ ক্রমান্বয়ে চলতেই থাকে কিন্তু তা দৃষ্টিগোচর হয় না। সেই ভাবেই জলপ্রবাহবৎ বেগবান কালের প্রভাবে প্রাণীকুলের শরীরের উৎপত্তি ও বিনাশ সমানে হতেই থাকে কিন্তু অজ্ঞানতার কারণে তা দৃষ্টিগোচর হয় না।


রাজন! আমি সূর্যের কাছ থেকে এই শিক্ষা গ্রহণ করেছি। সূর্য নিজের আলোকরশ্মির দ্বারা পৃথিবীর জল আকর্ষণ করে এবং উপযুক্ত সময়ে তা বৃষ্টিরূপে বর্ষণ করে দেয়। তেমনভাবেই যোগীপুরুষের উচিত প্রযোজন অনুসারে যথাসময়ে ইন্দ্রিয়াদি দ্বারা বিষয়বস্তু গ্রহণ করলেও উপযুক্ত সময়ে তা পরিত্যাগ করা। কোনো সময়েই তার ইন্দ্রিয়াদি বিষয়ে আসক্তি যেন না আসে। স্থূলবুদ্ধিসম্পন্ন ব্যক্তিদের বিভিন্ন জলপাত্রে প্রতিবিম্বিত সূর্য তার মধ্যেই প্রবিষ্ট এবং ভিন্ন ভিন্ন বোধ হয়, কিন্তু তাতে সূর্য একাধিক হয়ে যায় না। তেমনভাবেই স্থাবর-জঙ্গম উপাধিসমূহের ভেদজ্ঞানে এমন বোধ হয় যেন প্রত্যেক ব্যক্তির মধ্যে আত্মা ভিন্ন ভিন্ন। কিন্তু যার এইরূপ বোধ তার বুদ্ধি স্থূল। বস্তুত আত্মা সূর্যবৎ একই। স্বরূপত তাতে কোনো ভেদ নেই।"


দ্বিতীয় পর্ব এখানেই শেষ করছি। পরবর্তী পর্ব শীঘ্রই আসছে। শেষ পর্যন্ত যারা পড়েছেন তাদেরকে অসংখ্য ধন্যবাদ।


তথ্যসূত্র:- শ্রীমদ্ভাগবত পুরাণ 


✍️:অর্ক বিশ্বাস

গবেষক, সনাতন শাস্ত্র গবেষণা কমিটি

।ॐ।সত্যের সন্ধানে সনাতন।ॐ।


পরবর্তী পর্ব দেখতে ক্লিক করুন

পূর্ববর্তী পর্ব দেখতে ক্লিক করুন


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নবীনতর পূর্বতন



ধর্মীয় বাণী/উপদেশ

"দেবী! তুমি স্বাহা, তুমি স্বধা এবং তুমিই বষটকার। স্বরও তোমারই স্বরূপ। তুমিই জীবনদায়িনী সুধা। নিত্য অক্ষর প্রণবের অকার, উকার, মকার-এই তিনমাত্রারূপে তুমিই স্থিত, আবার এই তিন মাত্রা ছাড়া বিন্দুরূপা যে নিত্য অর্দ্ধমাত্রা-যাকে বিশেষরূপে আলাদাভাবে উচ্চারণ করা যায় না, তাও তুমিই। " (শ্রী শ্রী চন্ডীঃ ১/৭৩-৭৪)