বাংলা বর্ষপঞ্জি ও নববর্ষ

 


বাংলা নববর্ষ মূলত সৌর পঞ্জিকার উপর নির্ভরশীল। সূর্যোদয় এর উপর ভিত্তি করে দিন গণনা করা হয় এই পঞ্জিকায়। এমনকি সূর্যের গতিবিধির উপর নির্ভর করে অন্যান্য হিসাব নিকাশও করা হয়। এই পঞ্জিকাটি হিন্দুদের সূর্য সিদ্ধান্তের উপর ভিত্তি করে তৈরি হয়েছে । সূর্য সিদ্ধান্ত হচ্ছে হিন্দুদের প্রাচীন জ্যোতিষ এর অংশ বা হিন্দু জ্যোতিষ শাস্ত্র নির্ভর হিসাব নিকাশ সমৃদ্ধ একটি গ্রন্থ

সূর্য সিদ্ধান্ত গ্রন্থের প্রথম অধ্যায় এর ত্রয়োদশ শ্লোক অনুযায়ী সময়ের হিসাব নিচের ছবিতে দেওয়া হলো -

"সূর্যের এক রাশি হইতে পরবর্তী রাশি সংক্রমণ পর্যন্ত যে সময় তাহার নাম সৌর মাস। ঐরূপ দ্বাদশ সৌর মাসে এক বৎসর হয়।" এখানে উল্লেখিত বৎসরই হচ্ছে সৌর বৎসর। এখানে বর্ণিত রাশি হচ্ছে জ্যোতিষ শাস্ত্রে উল্লেখিত ১২ টি রাশি। আমাদের শাস্ত্র অনুযায়ী রয়েছে নয়টি গ্রহ (বিজ্ঞানের গ্রহ আর আমাদের শাস্ত্রে বর্ণিত গ্রহ এক নয়), ২৭ টি নক্ষত্র।
রাশিগুলো  হচ্ছে - মেষ, বৃষ, মিথুন, কর্কট, সিংহ, কন্যা, তুলা, বৃশ্চিক, ধনু, মকর, কুম্ভ ও মীন। গ্রহগুলো হচ্ছে - রবি বা সূর্য, চন্দ্র, মঙ্গল, বুধ, বৃহস্পতি, শুক্র, শনি, রাহু ও কেতু। নক্ষত্রগুলো হচ্ছে - অশ্বিনী, ভরণী, কৃত্তিকা, রোহিণী, মৃগশিরা, আর্দ্রা, পুনর্ব্বসু, পুষ্যা, অশ্লেষা, মঘা, পূর্ব্বফল্গুনী, উত্তরফল্গুনী, হস্তা, চিত্রা, স্বাতি, বিশাখা, অনুরাধা, জ্যেষ্ঠা, মূলা, পূর্ব্বাষাঢ়া, উত্তরাষাঢ়া, শ্রবণা, ধনিষ্ঠা, শতভিষা, পূর্ব্ব-ভাদ্রপদা, উত্তরভাদ্রপদা এবং রেবতী। 
প্রতিটি গ্রহের অধীনে তিনটি করে নক্ষত্র থাকে। গ্রহগুলো নিজেদের অবস্থান পরিবর্তন করে আর এইসব অবস্থানের ভিত্তিতেই সনাতন ধর্মের বিভিন্ন পূজা পার্বণ অনুষ্ঠিত হয়।

নতুন বছর যেনো মঙ্গলময় হয় সেকারণে পূজা পার্বণ, বিভিন্ন আঞ্চলিক ব্রত ও বিভিন্ন লোকাচার পালিত হয়। বিশেষ করে দেব শিল্পী বিশ্বকর্মা, সিদ্ধিদাতা গণেশ ও সৌভাগ্যের দেবী লক্ষ্মীর পূজা অর্চনা করা হয়।

★ এগুলো হচ্ছে ধর্মীয় ভিত্তি এবার আসি ঐতিহাসিক ভিত্তি নিয়ে -
নিজেদের মান সম্মান নিজেরাই নষ্ট করতে বাঙ্গালী অনেক পটু! তাই নিজেদের বীরত্বের সঠিক ইতিহাসকে ধুলিস্যাৎ করে দিয়ে নিজেদের দাসত্বের ইতিহাস মুখস্ত করতে ব্যস্ত থাকে। আমি আজ ইতিহাসের প্রায় হারিয়ে যাওয়া একটি অধ্যায়ের আংশিক বিষয় বর্ণনা করার চেষ্টা করব! পাঠকদের আগ্রহের উপর ভিত্তি করে পরবর্তীতে আরো বিস্তৃত লেখার চেষ্টা করা হবে।

প্রত্যেকবার বাংলা নববর্ষ শুরু হলে একটি বিতর্ক শুরু হয়ে যায়। আধুনিক ইতিহাস অনুরক্তগণ ও বিদ্যার্থীগণ বিকৃত ইতিহাস সমৃদ্ধ গ্রন্থ পাঠ করে ভুল ইতিহাস ছড়িয়ে দেয়, অধিকাংশের মতে মোঘল সম্রাট আকবরই বাংলা বর্ষপঞ্জি (যা সূর্যের গতিবিধির উপর নির্ভরশীল) চালু করেন। আকবরের সময়কাল হচ্ছে, ১৫৫৬ থেকে ১৬০৫ খ্রিস্টাব্দ। এখন খ্রিস্টাব্দ আর বঙ্গাব্দ এর মধ্যে পার্থক্য হচ্ছে - ৫৯৪, যদি পূর্বের পদ্ধতি অনুযায়ী অগ্রহায়ণ মাস থেকে বছর গণনা ধরা হয় তবে ৫৯৩ বছরের ব্যবধান (আমরা ৫৯৩ বছর হিসাব ধরেই গণনা করবো)। তাছাড়া একজন ব্যক্তি জন্মের পরপরই নতুন বর্ষ পঞ্জিকা চালু করতে পারে না। তাই আকবর বাংলা বর্ষ পঞ্জিকা চালু করেছেন এটা সম্পূর্ণ ভুল! তারা পরের দাবি অনুযায়ী বলে যে, পহেলা বৈশাখে ঘরে ঘরে ফসল উঠে আর খাজনা গ্রহণের জন্য "তারিখ ই ইলাহী" চালু করেন এবং এরপর থেকেই পহেলা বৈশাখ উদযাপন হয়। কিন্তু, বৈশাখের প্রথম দিন কোনো ফসল উঠতো না। আর এখন যে ফসল বিভিন্ন স্থানে উঠে সেটাও কিন্তু সম্পূর্ণ ভাবে বৈশাখের প্রথম দিন উঠে না এমনকি সবার ফসল একই সময়ে ঘরে উঠে না। তাই তাদের এই ভিত্তিও ভুল।

এখন ৫৯০ খ্রিস্টাব্দের পর থেকে ইতিহাস জানতে হবে - কে বা কারা বঙ্গের উপর শাসন করেছে এবং তাতেই জানা যাবে বঙ্গাব্দ নামক বর্ষপঞ্জির প্রচলন সম্পর্কে । আনুমানিক ৫৫০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত গুপ্ত সাম্রাজ্য শাসন করেছে ভারতবর্ষকে। তাদের পরে এবং পালদের আধিপত্য বিস্তারের পূর্ব পর্যন্ত অনেকের মতে শাসন ব্যবস্থায় কিছুটা অরাজকতা সৃষ্টি হয়। এই অরাজকতার সময়েই সামন্ত রাজাদের প্রভাব ছিলো। ঐসকল সামন্ত রাজারা মূলত গুপ্তদের সাথেই কাজ করতেন। এই সকল সামন্ত, মহাসামন্তদের থেকেই উঠে আসেন বঙ্গের এক অন্যতম সম্রাট শশাঙ্ক।গবেষকদের অনুমান অনুযায়ী সম্রাট শশাঙ্ক মূলত গুপ্তদের বংশধর। কিন্তু অন্য ঐতিহাসিকদের মতে এটা একদমই সঠিক নয় এবং তাদের অনেকের মত অনুযায়ী আবার শশাঙ্ক ছিলেন মহাসামন্ত। সম্রাট শশাঙ্কের জন্ম নিয়ে সঠিক তথ্য প্রমাণ পাওয়া খুবই দুষ্কর। তবে বঙ্গের জাতীয় ইতিহাস গ্রন্থ অনুযায়ী মহারাজ শশাঙ্ক, দেব বংশীয় শাণ্ডিল্য গোত্রীয় কায়স্থ তথা ক্ষত্রিয় ছিলেন। শশাঙ্কের রাজধানী ছিলো কর্ণ সুবর্ণ এবং রাজ্য ছিলো গৌড়। অনেকের মতে গৌড় আর বঙ্গ (বাংলা, বিহার, উড়িষ্যাকে একত্রে তখন বঙ্গ বলা হতো) হচ্ছে আলাদা এবং সম্রাট শশাঙ্ক বঙ্গ জয় করেন আবার অনেকের মতে বঙ্গকে নিয়েই ছিলো শশাঙ্কের গৌড় রাজ্য। গবেষণা বলে যে, ৫৯০ খ্রিস্টাব্দের পর থেকে বিভিন্ন স্থানে সামন্ত রাজাদের সাথে নিয়ে সম্রাট শশাঙ্ক (যদিও তখনও সম্রাট বা পরিপূর্ণ রাজা হন নি) ভারতের বিভিন্ন অঞ্চল অধিকার করেন।সঠিক সময়, ইতিহাস থেকে পাওয়া না গেলেও ৬০০ খ্রিস্টাব্দের পূর্বে শশাঙ্কের প্রভাব ইতিহাসে পাওয়া যায়। একটি মতে, ৫৯৪ খ্রিস্টাব্দে সম্রাট শশাঙ্ক সিংহাসনে আরোহণ করেন। 
সবকিছুর ভিত্তিতে এটুকু বলা চলে, নতুন রাজা কর্তৃক নিজের সম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার জন্য ও শাসন ব্যবস্থা পরিচালনার জন্য "নতুন বর্ষপঞ্জি" চালু করাটা অতি স্বাভাবিক । আকবর যেমন গদিতে বসে তারিখ ই ইলাহী চালু করেন তেমনি শশাঙ্ক পুরোপুরি ক্ষমতায় বসার পূর্বেই সূর্যের গতিপথের উপর নির্ভরশীল একটি নতুন বছর চালু করেন আর সেটাই বঙ্গাব্দ নামে পরিচিতি লাভ করেছে । 


এবার হয়তো বলতে পারেন পহেলা বৈশাখ কিভাবে চালু হলো? এবার তবে এটা নিয়েও বলবো । অগ্রহায়ণ থেকে একসময় বছর শুরু হতো (পূর্বেই বলেছি) কারণ একই সাথে বর্ষ বরণ এর উৎসব ও ফসল ঘরে তোলার উৎসব । কিন্তু হেমন্ত কালীন এই ফসল উৎপাদনের ক্ষেত্রে এমনকি কৃষি ক্ষেত্রে পূর্বের মতো আড়ম্বর পাওয়া যায় না। এছাড়াও, বৈশাখ থেকে বছর গণনার এই পরিবর্তনের সঠিক ইতিহাস আমার মতে পাওয়া যায় না। যেখানে বঙ্গ সম্রাট শশাঙ্ক বিষয়ক তথ্য সংগ্রহের জন্য শশাঙ্কের শত্রু হর্ষবর্ধন ও বিদেশী বৌদ্ধদের গ্রন্থকে ভিত্তি মানা হয় সেখানে সঠিক ইতিহাস বিলুপ্ত হওয়া অতি স্বাভাবিক। 

(বৌদ্ধরা যখন ভারত শাসনের চেষ্টা করে সত্য সনাতন ধর্মকে ধ্বংস করার যজ্ঞে নেমেছিলো তখন শিব ভক্ত শশাঙ্ক তাদের রোধ করেন। শশাঙ্ক সর্বদাই অপরাজিত ছিলেন এবং সেকারণেই ভুল ইতিহাস ছড়িয়ে দিয়ে বাঙালীর মন থেকে শশাঙ্ককে মুছে ফেলার একটি চেষ্টা করা হয়েছে। তাদের এইসব ভুল ইতিহাস অনুযায়ী হর্ষবর্ধন শশাঙ্ককে পরাস্ত করেন কিন্তু এটা সম্পূর্ণ ভুল একটি দাবি। অধিকাংশ লোকজন এসব ভুল দাবীকেই সঠিক মনে করে অথচ একবারও ভাবে না যে, সনাতন আদর্শ ছাড়া ইতিহাসে এমন কেউ নেই যে নিজের শত্রুদের ভালো গুণের প্রশংসা করেছে।)


লেখাটি সমর্পণ করছি আমার পরম আরাধ্য মহাদেবের চরণে 🥀🙏

জয় বঙ্গ🙏
জয় শশাঙ্ক🙏

তথ্যসূত্র - 
সূর্য সিদ্ধান্ত (শ্রী বিজ্ঞানানন্দ স্বামী)
বঙ্গের জাতীয় ইতিহাস (নগেন্দ্রনাথ বসু)
বাংলার ইতিহাসে শশাঙ্ক (গিরিজাশঙ্কর রায়চৌধুরী)
ও ইন্টারনেটের বিভিন্ন সোর্স 


✍️ বৃহদ্রথ সান্যাল 
সহায়তায় - সাত্যকি দেব 
RCSS of SSS
।ॐ।সত্যের সন্ধানে সনাতন।ॐ।




















3 মন্তব্যসমূহ

  1. খুব সুন্দর হয়েছে লেখাটি। অনেক তথ্যবহুল। অনেক অজানা তথ্য জানতে পারলাম। আবার আগ্রহে থাকবো, এমন লেখা পড়ার জন্য।

    উত্তরমুছুন
  2. অসাধারণ। লেখাটা খুব উপযোগী। জয় বঙ্গ🚩

    উত্তরমুছুন
নবীনতর পূর্বতন



ধর্মীয় বাণী/উপদেশ

"দেবী! তুমি স্বাহা, তুমি স্বধা এবং তুমিই বষটকার। স্বরও তোমারই স্বরূপ। তুমিই জীবনদায়িনী সুধা। নিত্য অক্ষর প্রণবের অকার, উকার, মকার-এই তিনমাত্রারূপে তুমিই স্থিত, আবার এই তিন মাত্রা ছাড়া বিন্দুরূপা যে নিত্য অর্দ্ধমাত্রা-যাকে বিশেষরূপে আলাদাভাবে উচ্চারণ করা যায় না, তাও তুমিই। " (শ্রী শ্রী চন্ডীঃ ১/৭৩-৭৪)