বেদের সংহিতা ভাগের মন্ত্রে নারীদের বুদ্ধিহীন বলার বিষয়ে অপপ্রচার খণ্ডন


"ঋগবেদ শাকল শাখার অষ্টম (৮) মণ্ডলের ত্রয়োত্রিংশ (৩৩) সূক্তের সপ্তদশ (১৭) মন্ত্র দ্বারা নারীদের বুদ্ধিহীন বা কম বুদ্ধিসম্পন্ন বলা হয়েছে বলে একটি দাবি করা হয় । সবচেয়ে প্রাচীন বেদ ভাষ্যের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ এবং সর্ব সাধারণ হিন্দুদের মান্য বেদ ভাষ্য তথা সায়ণ ভাষ্যকে কিছু স্বার্থপর লোক এই মন্ত্রের দ্বারাও ভুল বলে থাকেন ।"
★তাদের দাবিগুলোর সত্যতা যাচাই করা যাক........


সর্বাগ্রে মন্ত্রটি দেখুন (সায়ণ ভাষ্য সহ) —

ইন্দ্ৰশ্চিদঘা তদব্রবীৎ স্ত্রিয়া অশাস্যং মনঃ।
উড অহ ত্রুতুং রঘুম্ ৷৷ 
[ঋগবেদ - শাকল শাখা - ৮/৩৩/১৭]

সায়ণ ভাষ্য (বাংলা উচ্চারণে সংস্কৃত) :
যো মেধ্যাতিথের্ধনপ্রদাতা প্লায়োগিরসঙ্গ স পুমান্ ভূত্বা স্ত্র্যভবঃ। তদা যদিন্দ্র উবাচ তদিদমাহ্। তথা চাহুঃ- 'প্লায়োগিশ্চাসঙ্গো য়ঃ স্ত্রী ভূত্বা পুমনাভূত স মেধ্যাতিথয়ৈ দানম্ দত্ত্বা' ইতি। ইন্দ্রশ্চিদ্ব ইন্দ্রঃ খলু তদব্রবীৎ। খিয়ৌঃ মনঃ চিত্তম্ অশাস্যম্ পুরুষেণাশিষ্যম্ শসিতুমশাক্যং প্রবলত্বাদিতি । উতো অপি চ স্ত্রীয়াঃ ক্রতুং প্রজ্ঞাং রঘু লঘুমাহ॥
ঋগবেদ - শাকল শাখা - ৮/৩৩/১৭ (সায়ণ ভাষ্য)ঋগবেদ - শাকল শাখা - ৮/৩৩/১৭ (সায়ণ ভাষ্য)

সায়ণ ভাষ্য অনুযায়ী অনুবাদ - (মেধ্যাতিথির সম্পদ প্রদানকারী প্রয়োগী যখন একজন পুরুষ থেকে স্ত্রী এ রূপান্তরিত হয়েছিল) তখন ইন্দ্র নিজেই বলেছিলেন যে "নারীর মনকে শাসন করা অসম্ভব। নারীর ক্রতু লঘু।"


এখানে, একদল অপপ্রচারকারী নিজেদের মান্য ভাষ্য দ্বারা সর্বজন মান্য আচার্য্য সায়ণের বেদ ভাষ্যকে ভুল প্রমাণ করতে চায় । কিন্তু তাদের মান্য ভাষ্য গুলোতে মন্ত্রের মূল অর্থের সাথে ব্যাখ্যা যুক্ত রয়েছে। তাদের মান্য তুলসীরাম শর্মার বেদ ভাষ্য থেকে লক্ষ্য করুন -

শেষে মূল অর্থ ছাড়াও বন্ধনীতে আরেকটু অংশ রয়েছে যা মূলত মূল মন্ত্র বহির্ভূত অংশ, তারা এটাকে ব্যাখ্যা হিসেবেই গ্রহণ করে। 

আমাদের মান্য ভাষ্যে এইভাবে সবসময় ব্যাখ্যা যুক্ত থাকে না। কিন্তু আমাদের পরম্পরানুগ আচার্য্যগণ অনেক গ্রন্থ লিখেছেন আর সেগুলো অনুযায়ী বর্তমানের পরম্পরানুগ আচার্য্যগণ এই মন্ত্রগুলো ব্যাখ্যা করে নিজ নিজ শিষ্যদের শিক্ষা প্রদান করেন। সায়ণ ভাষ্যকে ভুল দাবি করার পূর্বে পরম্পরানুগ আচার্য্য বা তাহাদের শিষ্যদের নিকট অথবা তাদের অনুসারীদের নিকট এইসকল সংশয় নিয়ে প্রশ্ন করা কর্তব্য! 
তারা (অপপ্রচারকারী) যদি ব্যাখ্যার দ্বারা সংশয় নিরসন করার অধিকারী হয় তবে আমাদের ব্যাখ্যা না জেনেই আমাদের মান্য ভাষ্যকে ভুল দাবি করা কতটুক যুক্তি-যুক্ত? (পাঠকগণ বিবেচনা করবেন)

দাবি - ১ : জয়দেব শর্মার আধিভৌতিক অর্থ অনুযায়ী ইন্দ্র এখানে মূলত বিদ্বান (এখানে উহ্য দাবিগুলো হচ্ছে - তুলসীরাম শর্মার অনুবাদ অনুযায়ী ইন্দ্র হচ্ছেন মূলত স্বামী, বেদ মন্ত্রের ত্রিবিধ অর্থ হয়)
খণ্ডন : বেদাঙ্গ নিরুক্ত অনুযায়ী, ত্রিবিধ ঋক মানে তিন প্রকারের মন্ত্র। এ নিয়ে নিরুক্ত সপ্তম অধ্যায়ের প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় পরিচ্ছেদে বিস্তারিত আছে। প্রকার বলতে বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন মন্ত্র। নিরুক্ত ১২/৩৭ অনুযায়ী একটি মন্ত্রের বৈশিষ্ট্য একাধিক প্রকারের (সাধারণত দুই প্রকারের উদাহরণ পাওয়া যায়) সঙ্গে মিল থাকতে পারে।
মূল মন্ত্রে ইন্দ্র হচ্ছেন দেবতা, "দেব লোক ও মনুষ্য লোক" উল্লেখ করে নিরুক্ত প্রথম অধ্যায়ের তৃতীয় পাদ, নবম পরিচ্ছেদে বর্ণিত হয়েছে অর্থাৎ দেব লোক ও মনুষ্য লোক আলাদা করা হয়েছে। সুতরাং ইন্দ্র কখনোই মানুষ নয়, ইন্দ্র হচ্ছেন মন্ত্রের দেবতা। ঈশ্বরের যে প্রকাশ তথা দেবতার উদ্দেশ্যে যে মন্ত্র দ্বারা প্রার্থনা করা হয় সেটিই মূলত মন্ত্রের দেবতা। 
<অমরেশ্বর ঠাকুরের নিরুক্ত অনুযায়ী>

দাবি - ২ : সায়ণ রঘু শব্দ ভুল করে লঘু করেছেন । রঘু এর মূল অর্থ কুশল । 
খণ্ডন : আপনাদের এক আচার্য্য হরিশরণ সিদ্ধান্তলঙ্কার রঘু অর্থ করেছেন গতিশীল আর উপরে দেওয়া ছবি অনুযায়ী তুলসীরাম শর্মা নিজেই মন্ত্রে উল্লেখিত রঘু অর্থ লঘু করেছেন (ব্যাখ্যা যুক্ত করেছেন ঠিকই, সেরকম ব্যাখ্যা আমাদেরও আছে ; পূর্বে বলা হয়েছে কিভাবে ব্যাখ্যাগুলো পাওয়া যায় তথাপি সামনে বুঝানোর চেষ্টা করা হবে)। মূলত রঘু শব্দের অর্থ চঞ্চল বা গতিশীল বা দ্রুত বা আলো (আলো শুধু একটি অর্থই রয়েছে এবং এই অর্থ পূর্বের অর্থের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয় বিধায় কোনো আচার্য্য বা পণ্ডিত গ্রহণ করেন নি)। আপ্টে অভিধানেও আছে - 

এবার আচার্য্য সায়ণ কৃত সংস্কৃত ভাষ্যতে দেখে নিন রঘুকে লঘু অর্থ করা হয় নি, শেষের দিকে রয়েছে - রঘু লঘুমাহ  । অভিধান অনুযায়ী অর্থ হবে, দ্রুত লঘু হয় সার অর্থ অনুযায়ী শুধু লঘু হয় এমন বললেও চলে।



সায়ণ ভাষ্য অনুযায়ী মূল মন্ত্রের ব্যাখ্যা :

নিরুক্ত ২/১৮ অনুযায়ী ক্রতু শব্দের দুটো অর্থ হয় - কর্ম ও প্রজ্ঞা। প্রজ্ঞা মানে হচ্ছে বুদ্ধি (সকলে বুদ্ধি অর্থই নিয়েছেন তাই এখানেও আচার্য্য সায়ণ ভুল করেন নি)। অর্থাৎ, বুদ্ধি লঘু কিন্তু অনুবাদে লক্ষ্য করুন - এটা সব নারীকে বলা হয় নি,  একজন বিশেষ নারী যে পুরুষ থেকে নারীতে রূপান্তর হয়েছিলো (সায়ণ আচার্য কৃত বাংলা উচ্চারণ সংস্কৃত ভাষ্য ও ভাষ্য অনুযায়ী অনুবাদে দেখুন)। এর পরের মন্ত্রে প্রয়োগী যে নারী হয়ে গিয়েছিলো সেটা রয়েছে। সেটা নিয়েও অপপ্রচার হয় এবং সেটারও খণ্ডন করা হয়েছে তাছাড়া বিভিন্ন প্রচলিত ও পরম্পরানুগ অনুকরণে তৈরি বেদ ভাষ্যের টীকাতেও প্রয়োগীর বিষয় নিয়ে পাবেন। বিস্তারিত এই লিঙ্কেও পাবেন - https://sanatan22sss.blogspot.com/2024/04/blog-post.html 
বেদের দুটো ভাগ আছে - মন্ত্র ও ব্রাহ্মণ। দুটো ভাগ নিয়েই বেদ। বেদের রয়েছে পাঁচটি ভেদ যথা : বিধি, মন্ত্র, নামধেয়, নিষেধ এবং অর্থবাদ। তার মধ্যে ব্রাহ্মণ হচ্ছে বিধি ও অর্থবাদ নিয়ে। বিধি ও নিষেধ দ্বারা মূলত কর্তব্য ও অকর্তব্য বুঝানো হয়। মন্ত্র যেহেতু আলাদা একটি ভেদ সেহেতু ইহা কর্তব্য ও অকর্তব্য বিষয়ক নির্দেশ প্রদান করে না। 
মীমাংসা ন্যায় প্রকাশ - আপদেবের বিরচিত 


সিদ্ধান্ত : যেহেতু সকল নারীর উদ্দেশ্যে দাবিকৃত বক্তব্য বর্ণিত নয় এবং বেদের সংহিতা বা মন্ত্র ভাগে যেসব অর্থ করা হয়েছে সেগুলো বাস্তবিক জীবনে প্রায়োগিক নয় সেহেতু, "নারীদের বুদ্ধি কম" বিষয়টি আমরা বাস্তব জীবনের সত্য হিসেবে গ্রহণ করতে পারি না। বেদাঙ্গ বিচার অনুযায়ী বেদের সায়ণ ভাষ্যকে ভুল বলাও অযৌক্তিক! 

ভুল ত্রুটি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন🙏
জয় সনাতন🙏



✍️ বৃহদ্রথ সান্যাল 
Senior researcher - Research Committee of Sanatan Scripture
।ॐ।সত্যের সন্ধানে সনাতন।ॐ।













একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নবীনতর পূর্বতন



ধর্মীয় বাণী/উপদেশ

"দেবী! তুমি স্বাহা, তুমি স্বধা এবং তুমিই বষটকার। স্বরও তোমারই স্বরূপ। তুমিই জীবনদায়িনী সুধা। নিত্য অক্ষর প্রণবের অকার, উকার, মকার-এই তিনমাত্রারূপে তুমিই স্থিত, আবার এই তিন মাত্রা ছাড়া বিন্দুরূপা যে নিত্য অর্দ্ধমাত্রা-যাকে বিশেষরূপে আলাদাভাবে উচ্চারণ করা যায় না, তাও তুমিই। " (শ্রী শ্রী চন্ডীঃ ১/৭৩-৭৪)