মানুষের জীবনে আধ্যাত্মিক উন্নতির জন্য একজন গুরু আবশ্যক। গুরুই একজনকে সঠিক পথ দেখিয়ে উন্নতির দিকে নিয়ে যেতে পারে। শাস্ত্র অধ্যয়ন করলে কিংবা মহাপুরুষদের জীবনী অধ্যয়ন করলে দেখা যায় প্রত্যেক সিদ্ধ পুরুষের জীবনে অন্তত একজন গুরুর অনস্বীকার্য ভূমিকা বিদ্যমান রয়েছে। তবে প্রকৃতপক্ষে সকল গুরুর গুরু পরম গুরু হচ্ছেন স্বয়ং ঈশ্বর।
স পূর্বেষামপি গুরুঃ কালেনানবচ্ছেদাৎ॥
সরলার্থ:- তিনি প্রাচীন গুরুদিগেরও গুরু, কারণ তিনি কাল দ্বারা সীমাবদ্ধ নন।
(পাতঞ্জল যোগদর্শন-১/২৬)
স্বয়ং ঈশ্বরই সাধকের নিকট প্রকৃত গুরু রুপে প্রকট হয়ে সাধকের মার্গ দর্শন করেন।
গুরুর্ব্রহ্মা গুরুর্বিষ্ণু গুরুর্দেবো মহেশ্বরঃ।
গুরুরেব পরং ব্রহ্ম তস্মৈ শ্রীগুরবে নমঃ॥
সরলার্থ:- শ্রীগুরুই ব্রহ্মা, শ্রীগুরুই বিষ্ণু, শ্রীগুরুই শিব। শ্রীগুরুই সচ্চিদানন্দ পরমব্রহ্ম। সেই শ্রীগুরুকে প্রণাম করি॥
(গুরুগীতা-২৪)
আমাদের প্রায় প্রত্যেকেরই একটি বদ্ধমূল ধারণা যে কেবলমাত্র মানুষরুপেই একজন গুরু এসে আমাদেরকে পথ প্রদর্শন করতে পারে। কিন্তু ইতিহাস-পুরাণে এমন দৃষ্টান্তও দেখতে পাওয়া যায় যেখানে গুরু সাধকের নিকট মানুষরুপে আবির্ভূত না হয়ে দেবতারূপে আবির্ভূত হয়ে বা প্রকৃতির মাধ্যমেই সাধককে মার্গ দর্শন করিয়েছেন। আজ শ্রীমদ্ভাগবত পুরাণ (উল্লেখ্য ভাগবত পুরাণ মূলত দুইটি, একটি বিষ্ণুভাগবত পুরাণ, অপরটি দেবীভাগবত পুরাণ। এখানে বিষ্ণুভাগবত পুরাণের কথা উল্লেখ করেছি) হতে এমনি একটি উপাখ্যানের প্রথম পর্ব তুলে ধরার চেষ্টা করব যেখানে একজন সাধক বিশ্বপ্রকৃতিকে গুরু রুপে বরণ করে প্রকৃতি থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে সাধনা করেছেন এবং সিদ্ধি লাভ করেছেন।
একবার ধর্ম মর্মজ্ঞ রাজা যদু দেখলেন যে এক ত্রিকালদর্শী তরুণ অবধূত ব্রাহ্মণ নির্ভয়ে বিচরণ করছেন। তখন তিনি তাঁকে প্রশ্ন করলেন। রাজা যদু জিজ্ঞাসা করলেন- "হে ব্রহ্মন! আপনি কর্মে লিপ্ত না থেকেই কেমন করে এই সুনিপুণ বুদ্ধি অর্জন করলেন? যার আশ্রয়ে থেকে আপনি পরম বিদ্বান হওয়া সত্ত্বেও বালকবৎ জগতে বিচরণ করে থাকেন! সাধারণত মানব আয়ু, যশ অথবা সৌন্দর্যের অভিলাষ নিয়েই ধর্ম, অর্থ, কাম অথবা তত্ত্বজিজ্ঞাসাতে প্রবৃত্ত হয়ে থাকে; অকারণে কোথাও প্রবৃত্তির উন্মেষ দেখা যায় না। আমি দেখছি আপনি কর্ম সম্পাদনে সমর্থ, বিদ্বান ও নিপুণ। আপনার ভাগ্য এবং সৌন্দর্য দুইই প্রশংসনীয়। আপনার বাণীতে যেন অমৃতের ক্ষরণ। তবুও আপনি জড়, উন্মত্ত অথবা পিশাচবৎ অবস্থায় থাকেন; আপনার কর্মও নেই, চাহিদাও নেই!॥ জগতের সিংহভাগ ব্যক্তিরা কাম ও লোভের দাবানলে দগ্ধ হচ্ছে। কিন্তু আপনাকে দেখে মনে হয় যেন আপনি তার থেকে মুক্ত। বনের হাতি যেমন বন থেকে বেরিয়ে নদীর জলে দাঁড়িয়ে আছে তদনুরূপ সাংসারিক দাবানলের আঁচও আপনার কাছে পৌঁছতে পারছে না॥ হে ব্রহ্মন্ ! আপনি পুত্র, স্ত্রী, সম্পত্তিরূপী সংসার থেকে স্পর্শরহিত। আপনি নিজ স্বরূপেই বিরাজমান। আমার জানতে ইচ্ছা করে যে কেমনভাবে আপনি আত্মাতেই এমন অনির্বচনীয় আনন্দ পেয়ে থাকেন? অনুগ্রহ করে আমার এই জিজ্ঞাসার সমাধান করুন।"
ব্রহ্মবেত্তা অবধূত দত্তাত্রেয় বললেন-" রাজন্! আমি নিজ বুদ্ধি সহযোগে বহু গুরুর কাছ থেকে শিক্ষাগ্রহণ করেছি এবং তার ফলে জগতে মুক্তভাবে সচ্ছন্দে বিচরণ করতে সক্ষম। তোমাকে তাঁদের পরিচয় দেব ও তাঁদের - কাছ থেকে পাওয়া শিক্ষার কথাও বলব।
আমার শিক্ষাগুরুদের নাম শোনো- পৃথিবী, বায়ু, আকাশ, জল, অগ্নি, চন্দ্র, সূর্য, কপোত, অজগর, সমুদ্র, পতঙ্গ, ভ্রমর বা মৌমাছি, হাতি, মধু সংগ্রাহক, হরিণ, মাছ, পিঙ্গলা বেশ্যা, কুহর পাখি, বালক, কুমারী কন্যা, বাণ নির্মাতা, সর্প, উর্ণনাভি এবং সুপেশকৃত (কাঁচপোকা)।
রাজন্! আমি এই চতুর্বিংশতি গুরুর শরণাগত হয়ে তাঁদের আচরণ থেকে শিক্ষা গ্রহণ করেছি॥
হে বীরবর যযাতিনন্দন! আমি যাঁর কাছ থেকে যেমন শিক্ষা লাভ করেছি তা যথাযথভাবে তোমাকে বলছি, শোনো।
আমি ধরিত্রীর কাছে তার ধৈর্য ও ক্ষমার শিক্ষা গ্রহণ করেছি। কত আঘাত, কত উৎপাতই না ধরিত্রীকে সহ্য করতে হয়। এর জন্য ধরিত্রীকে কোনো প্রতিহিংসামূলক আচরণ করতে দেখা যায় না; ক্রন্দন চিৎকার কিছুই না করে সে সব সহ্য করে। এই জগতে প্রাণীকূল প্রারব্ধানুসারে কর্মে সচেষ্ট হয় এবং জ্ঞাত বা অজ্ঞাতভাবে প্রতিকূলতার সৃষ্টি করে থাকে। ধীর ব্যক্তির উচিত তাদের বাধ্য-বাধকতা অনুধাবন করে কোন কিছুতেই ক্রোধ না করা এবং ধৈর্যচ্যুত না হওয়া। যথাবৎ নিজ আচরণে দৃঢ় থাকা।পৃথিবীর বৈগুণ্য পর্বত এবং বৃক্ষ থেকে আমি এই শিক্ষা গ্রহণ করেছি যে যেমন তাদের সমস্ত মহোদ্যমই সদা সর্বদা অপরের কল্যাণে হয়ে থাকে অথবা এও বলা যায় যে তাদের জন্মই জগতের মঙ্গলের জন্য হয়ে থাকে। সাধু ব্যক্তিদের উচিত যে তাদের শিষ্যত্ব গ্রহণ করে, তাদের কাছে পরোপকার করার শিক্ষা গ্রহণ করা।
আমি শরীরাভ্যন্তরে নিবাসকারী বায়ু-প্রাণবায়ুর কাছে এই শিক্ষা গ্রহণ করেছি যে, যেমন সে ক্ষুন্নিবৃত্তির ইচ্ছা পোষণ করে এবং তার প্রাপ্তিতে সন্তুষ্ট হয়ে যায় তেমন ভাবেই সাধকের পক্ষেও এই কাম্য যে জীবন নির্বাহ হেতু আবশ্যক ভোজনই যেন সে গ্রহণ করে। ইন্দ্রিয়াদির তৃপ্তি হেতু বহুবিধ পদার্থের কামনা অনুচিত। এক কথায় বিষয় উপভোগ যেন সেই সীমা লঙ্ঘন না করে যাতে বুদ্ধির বিকৃতি হয়, মনের চঞ্চলতা আসে আর বাণী ব্যর্থ কথোপকথনে লিপ্ত হয়।
শরীরের বাইরে অবস্থিত বায়ুর কাছে আমি এই শিক্ষা গ্রহণ করেছি যে, যেমন বায়ুকে নানা স্থানে যেতে হয় কিন্তু সে কোথাও আসক্ত হয়ে পড়ে না, কারো প্রতি গুণ অথবা দোষ আপন করে নেয় না তেমনভাবেই সাধক ব্যক্তির পক্ষেও এই কাম্য যে, প্রয়োজনানুসারে বিভিন্ন প্রকারের ধর্ম ও স্বভাবযুক্ত পরিবেশে গমন করেও যেন সে নিজ লক্ষ্যে স্থির থাকে। সে যেন কারো গুণ অথবা দোষের সম্মুখে আত্ম-সমর্পণ না করে; কারো প্রতি আসক্তি অথবা দ্বেষে যুক্ত না হয়। গন্ধ কখনো বায়ুর গুণ নয়, তা পৃথিবীর গুণ। কিন্তু গন্ধ বহন করবার দায়িত্ব বায়ুর। গন্ধ বহন করলেও বায়ু শুদ্ধই থাকে, গন্ধের সঙ্গে তার সম্পর্ক তৈরি হয়ে যায় না। তেমনভাবেই সাধকের যতক্ষণ এই পার্থিব শরীরের সঙ্গে সম্বন্ধ থাকে সে ব্যাধি-পীড়া, ক্ষুধা-তৃষ্ণাদি বহন করে যায়। কিন্তু যে সাধক নিজেকে শরীররুপে না দেখে আত্মারূপে দেখে থাকে সে শরীর এবং তার গুণের আশ্রিত হলেও তার থেকে সর্বতোভাবে নির্লিপ্ত থাকে।"
প্রথম পর্ব এখানেই শেষ করছি। পরবর্তী পর্ব শীঘ্রই আসছে। শেষ পর্যন্ত যারা পড়েছেন তাদেরকে অসংখ্য ধন্যবাদ।
তথ্যসূত্র:- শ্রীমদ্ভাগবত পুরাণ
✍️:অর্ক বিশ্বাস
গবেষক, সনাতন শাস্ত্র গবেষণা কমিটি
।ॐ।সত্যের সন্ধানে সনাতন।ॐ।
পরবর্তী পর্ব দেখতে ক্লিক করুন।
