প্রাচীন ভারতবর্ষ বহু দর্শনের জন্মভূমি। এর মধ্যে বৈদিক ধারার ছয়টি মূল দর্শনকে একত্রে ষড়দর্শন নামে অভিহিত করা হয়ে থাকে। ষড়দর্শন গুলো হলো: সাংখ্য, ন্যায়, বৈশেষিক, যোগ, পূর্ব মীমাংসা এবং বেদান্ত। নিম্নে এই ছয়টি দর্শনের আলোচ্য বিষয় সম্পর্কে সংক্ষেপে বর্ণনা করার চেষ্টা করছি।
১.সাংখ্য দর্শন:- সাংখ্য শব্দের অর্থ সম্যক জ্ঞান। এই দর্শনের প্রণেতা মহর্ষি কপিল। সামগ্রিক জগতের ত্রিবিধ প্রকারের দুঃখ হতে মুক্তিলাভই এই দর্শনের লক্ষ্য। এই ব্রহ্মাণ্ডকে সাংখ্যদর্শন চব্বিশটি তত্ত্বে বা আরো স্পষ্ট করে বললে চব্বিশ ধরণের পদার্থে বিভক্ত করে বিশ্লেষণ করে। এই চব্বিশটি তত্ত্ব হচ্ছে:-
🔸মূল প্রকৃতি
🔸মূল প্রকৃতির বিকার (অর্থাৎ প্রকৃতি হতে উৎপত্তিপ্রাপ্ত) মহতত্ত্ব (মহাজাগতিক বুদ্ধিমত্তা),
🔸মহতত্ত্বের বিকার অহংকার (অস্তিত্বের মধ্যে পৃথকত্ব উৎপাদনকারী তত্ত্ব)
🔸অহংকারের বিকার পঞ্চতন্মাত্র (শব্দ,স্পর্শ,রুপ,রস,গন্ধ)
🔸পঞ্চ জ্ঞানেন্দ্রিয় (চক্ষু,কর্ণ,নাসিকা,ত্বক,জিহ্বা)
🔸পঞ্চ কর্মেন্দ্রিয় (হস্ত,পদ,বাক,পায়ু,উপস্থ)
🔸মন
🔸পঞ্চ মহাভূত( মাটি,জল,বায়ু,অগ্নি,আকাশ)।
সাংখ্যের মতে এই চব্বিশটি তত্ত্ব নিয়েই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের যাবতীয় সবকিছু গঠিত। চব্বিশটি তত্ত্বকে একত্রে প্রকৃতি বলা হয়। তবে প্রথম তত্ত্ব মূল প্রকৃতিকেই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের আদিকারণ বলা হয় এবং বাকি ২৩ টি তত্ত্ব মূল প্রকৃতি থেকেই ক্রমানুসারে একটি হতে অপরটি উৎপন্ন। চব্বিশটি তত্ত্বের বাইরে পঞ্চবিংশতি একটি তত্ত্ব আছে যাকে বলা হয় পুরুষ (চেতনা)। প্রকৃতি প্রসবধর্মী অর্থাৎ প্রকৃতি থেকেই সবকিছু উৎপন্ন হয় কিন্তু পুরুষ নির্বিকার,অপরিণামী এবং চিরন্তন। পুরুষ হতে কোনোকিছু সৃষ্টি হয় না এবং পুরুষ নিজেও কোনোকিছু হতে সৃষ্ট নয়। এই পুরুষই জীবের প্রকৃত স্বরুপ। সাংখ্য দর্শনের বিষয়বস্তু ছয়টি অধ্যায়ে বর্ণিত হয়েছে। প্রথম অধ্যায়ে ইন্দ্রিয় দ্বারা ভোগ্য বিষয়গুলো সম্পর্কে নির্দিষ্ট করে আলোচনা করা হয়েছে, দ্বিতীয় অধ্যায়ে মূল প্রকৃতির কার্য এবং মূল প্রকৃতির থেকে পরিণামপ্রাপ্ত হয়ে অন্যান্য বাকি ২৩ কি তত্ত্বের একটি হতে অপরটির উৎপত্তি বর্ণনা করা হয়েছে অর্থাৎ ব্রহ্মাণ্ডের কাঠামো উৎপত্তি বর্ণনা করা হয়েছে, তৃতীয় অধ্যায়ে বিষয়ের প্রতি বৈরাগ্য উৎপাদনের বিষয়ে বর্ণনা করা হয়েছে, চতুর্থ অধ্যায়ে বৈরাগ্য উৎপাদনের জন্য একটি উপাখ্যানের অবতারণা করা হয়েছে, পঞ্চম অধ্যায়ে পরপক্ষের সম্ভাব্য বিভিন্ন যুক্তির খণ্ডন করে সাংখ্যমত প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে এবং ষষ্ঠ অধ্যায়ে সাংখ্যদর্শনের মূল বক্তব্য তুলে ধরা হয়েছে। প্রকৃতি ও পুরুষের যথার্থ জ্ঞানই সাংখ্যদর্শন। জীব নিজেকে প্রকৃতির সকল তত্ত্ব হতে ভিন্ন পুরুষরুপে জেনে এবং উপলব্ধি করেই দুঃখ হতে মুক্তি লাভ করতে পারে। বর্তমানে সাংখ্য দর্শনের প্রামাণ্য গ্রন্থ হিসেবে মহর্ষি কপিল বিরচিত 'সাংখ্য-প্রবচন সূত্র' এবং ঈশ্বরকৃষ্ণ বিরচিত 'সাংখ্যকারিকা' বহুল প্রচলিত।
২.ন্যায় দর্শন:- ন্যায় দর্শনের প্রণেতা মহর্ষি গৌতম। এটি পাঁচটি অধ্যায়ে বিভক্ত। এই দর্শন ১৬ টি বিষয়কে স্বীকৃতি দেয় এবং তত্ত্বজ্ঞান লাভের জন্য এই ১৬ টি বিষয়ের সংজ্ঞা, লক্ষ্মণ ও পরীক্ষাকে গুরুত্ব প্রদান করে। সেই ১৬ টি বিষয় হচ্ছে:-
🔹প্রমাণ (যা দ্বারা যথার্থজ্ঞান লাভ হয়)
🔹প্রমেয় (যথার্থ জ্ঞান)
🔹সংশয়
🔹প্রয়োজন
🔹দৃষ্টান্ত
🔹সিদ্ধান্ত
🔹অবয়ব (আনুমানিক উপাদান)
🔹তর্ক
🔹নির্ণয়
🔹বাদ (আলোচনা)
🔹জল্প (বিতর্ক)
🔹বিতণ্ডা (ধ্বংসাত্মক বিতর্ক)
🔹হেত্বাভাস (বিভ্রান্তি)
🔹ছল
🔹জাতি (নিষ্ফল আপত্তি)
🔹নিগ্রহ (পরাজয়ের স্থান)
ন্যায়মতে কোনো বিষয়ে বিশেষ জ্ঞান অর্জনের জন্য এই ১৬ টি বিষয় দিয়ে বিচার করা প্রয়োজনীয়। ন্যায় দর্শন প্রমাণকে চারটি শ্রেণিতে বিভক্ত করে:- প্রত্যক্ষ, অনুমান, উপমান (তুলনা) এবং শাব্দ (নির্ভরযোগ্য উৎসের শব্দ বা সাক্ষ্য)। ন্যায় দর্শন যাবতীয় দৃশ্যবস্তুর মৌলিক উপাদান হিসেবে পরমাণুর অস্তিত্ব স্বীকার করে। তাছাড়া জীবের কর্মফলদাতা এবং জগৎস্রষ্টা ঈশ্বরের অস্তিত্বও ন্যায়ে স্বীকৃত। মুক্তির বিষয়ে ন্যায়ের মত হচ্ছে, জীব ঈশ্বরের অনুগ্রহে তত্ত্বজ্ঞানে জ্ঞানী হয়ে সকলপ্রকার বিভ্রান্তি বা মিথ্যাজ্ঞান হতে নিবৃত্ত হতে পারলেই মুক্তিলাভ করে থাকে। ন্যায় দর্শনের প্রামাণ্য গ্রন্থ হচ্ছে মহর্ষি গৌতম বিরচিত 'ন্যায়সূত্র'।
৩.বৈশেষিক দর্শন:- বৈশেষিক দর্শনের প্রণেতা মহর্ষি কণাদ। এটি দশটি অধ্যায়ে বিভক্ত। বৈশেষিক দর্শন ছয়টি ভাবাত্মক বস্তু এবং অভাব নিয়ে আলোচনা করে। ছয়টি ভাবাত্মক বস্তু হচ্ছে:-
▪️দ্রব্য
▪️গুণ
▪️কর্ম
▪️সামান্য
▪️বিশেষ
▪️সমবায়
দ্রব্য ৯ প্রকার। সেগুলো হলো:-
🔸পৃথিবী
🔸জল
🔸অগ্নি
🔸বায়ু
🔸আকাশ
🔸কাল
🔸দিক
🔸আত্মা
🔸মন
গুণ ২২ প্রকার। যথা:-
🔹রুপ
🔹রস
🔹গন্ধ
🔹স্পর্শ
🔹সংখ্যা
🔹পরিমাণ
🔹পৃথকত্ব
🔹সংযোগ
🔹বিভাগ
🔹পরত্ব
🔹অপরত্ব
🔹বুদ্ধি
🔹সুখ
🔹দুঃখ
🔹ইচ্ছা
🔹দ্বেষ
🔹প্রযত্ন
🔹গুরুত্ব
🔹দ্রবত্ব
🔹স্নেহ
🔹সংস্কার
🔹ধর্ম
🔹অধর্ম
🔹শব্দ
কর্ম ৫ প্রকার। যথা:-
🔸উৎক্ষেপণ
🔸অবক্ষেপণ
🔸আকুঞ্চন
🔸প্রসারণ
🔸গমন
বৈশেষিক দর্শনে প্রত্যক্ষ এবং অনুমান এই দুই ধরনের প্রমাণ স্বীকৃত। বৈশেষিক দর্শন প্রকৃতির বিভিন্ন ঘটনার যৌক্তিক ব্যাখ্যা উপস্থাপন করে। ন্যায় দর্শনের মতো এই দর্শনের মতেও যাবতীয় সকল বস্তুই পরমাণু নামক এক বিশেষ পদার্থ দ্বারা নির্মিত যা নিত্য এবং অবিনাশী। পরমাণুগুলোর পরস্পর সংযোগেই যাবতীয় দৃশ্য বস্তুর উৎপত্তি এবং বিয়োগেই যাবতীয় দৃশ্য বস্তুর বিনাশ নির্ধারিত। বৈশেষিক দর্শন স্পষ্টরুপেই জগতের সৃষ্টিকর্তা ঈশ্বরের অস্তিত্বকে স্বীকৃতি দেয়। ঈশ্বরের শক্তিতেই পরমাণুগুলো গতিপ্রাপ্ত হয়ে মিলিত হয়ে বিভিন্ন অবয়ব ধারণ করে আবার কালক্রমে পুনরায় বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। আত্মকর্ম অর্থাৎ শ্রবণ,মনন ও নিদিধ্যাসনের মাধ্যমে নিজ আত্মার সাক্ষাৎকার করাই মোক্ষলাভের উপায়। মহর্ষি কণাদ বিরচিত 'বৈশেষিক সূত্র' এই দর্শনের প্রামাণ্য গ্রন্থ।
৪.যোগ দর্শন:- যোগদর্শনের প্রণেতা হচ্ছেন মহর্ষি পতঞ্জলি। এই দর্শন চারটি পাদে বিভক্ত। প্রথম পাদে চিত্তবৃত্তি নিরোধক সমাধি, বৈরাগ্যের লক্ষ্মণ ও তার সাধনের উপায় বর্ণিত হয়েছে। দ্বিতীয় পাদে চিত্ত বিক্ষেপের নিরোধ দ্বারা সমাধি সিদ্ধির জন্য অষ্টাঙ্গ যোগ পর্যায়ক্রমে বর্ণিত হয়েছে। অষ্টাঙ্গ যোগ হচ্ছে:-
🔸যম
🔸নিয়ম
🔸আসন
🔸প্রাণায়াম
🔸প্রত্যাহার
🔸ধ্যান
🔸ধারণা
🔸সমাধি
অহিংসা, সত্য, অস্তেয় (চুরি না করা), ব্রহ্মচর্য এবং অপরিগ্রহ (অপরের নিকট হতে কিছু গ্রহণ না করা) হচ্ছে যমের অঙ্গ। শৌচ, সন্তোষ, তপস্যা, স্বাধ্যায় (আধ্যাত্মিক শাস্ত্র অধ্যয়ন) এবং ঈশ্বর প্রণিধান (ঈশ্বরভক্তি) নিয়মের অঙ্গ। শরীরকে যে অবস্থানে রাখলে এর কষ্ট না হয় এবং চিত্তকে সমাহিত করা যায় তার নাম আসন। শ্বাস-প্রশ্বাসের গতি সংযত করাকে বলে প্রাণায়াম। ইন্দ্রিয়গণকে নিজ নিজ বিষয় হতে পরিত্যাগ করিয়ে চিত্তের স্বরুপ গ্রহণ করানোই প্রত্যাহার। চিত্তকে কোন বিশেষ বস্ততে ধরে রাখার নাম ধারণা। ধ্যেয় বিষয়ে অবিচ্ছেদ্যভাবে চিত্তের সংযোগকে ধ্যান বলে এবং ধ্যানের অবস্থায় ধ্যেয় বিষয়ে চিত্তলীন হইলে ক্রিয়া এবং জ্ঞাতা দুয়েরই লয় হলে যে অবস্থার সৃষ্টি হয় তাকেই সমাধি বলে। যোগ দর্শনের তৃতীয় পাদে যোগের মহিমা এবং বিভিন্ন সিদ্ধির বিষয়ে বর্ণিত হয়েছে। চতুর্থ পাদে কৈবল্য বা মুক্তি সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। চিত্ত বা মনকে বিজাতীয় ধারণা বা চিন্তা হইতে মুক্ত করে ধ্যেয় বিষয়ে ধ্যানাদির দ্বারা যুক্ত করে সমাধি পর্যন্ত পৌঁছে দেওয়াই যোগ দর্শনের উদ্দেশ্য। অষ্টাঙ্গযোগ অনুশীলনের মাধ্যমে দৃশ্য প্রকৃতি হইতে দ্রষ্টা পুরুষের (জীবচেতনা) পৃথকত্ব সাধন এবং দ্রষ্টা পুরুষের নিজ স্বরূপে পরিপূর্ণ স্থিতি হলেই জীব মুক্তিলাভ করে। মহর্ষি পতঞ্জলি কৃত 'পাতঞ্জল যোগসূত্র' যোগ দর্শনের প্রামাণ্য গ্রন্থ।
৫.পূর্ব মীমাংসা দর্শন:- জৈমিনী ঋষি কর্তৃক মীমাংসা দর্শন প্রণীত। বারোটি অধ্যায়ে এর বিষয়বস্তু আলোচিত হয়েছে। আলোচ্য বিষয়গুলো হচ্ছে-
🔹ধর্ম প্রমাণ
🔹ধর্ম ভেদাভেদ
🔹শেষাশেষি বিভাগ
🔹ক্রতর্থ পুরুষার্থভেদ দ্বারা প্রযুক্তি বিশেষ
🔹ক্রমভেদ
🔹অধিকারী বিশেষ
🔹সামান্যাতিদেশ
🔹বিশেষাতিদেশ
🔹উহ
🔹বাধ
🔹তন্ত্র
🔹প্রসঙ্গ
ধর্ম প্রমাণ দ্বারা ধর্মজ্ঞানের প্রয়োজনীয়তা, ধর্মের লক্ষণ ও বেদবিহিত ক্রিয়াকলাপ বুঝিয়ে থাকে। ধর্ম ভেদাভেদ দ্বারা যাগ-যজ্ঞাদির প্রভেদ ও নানাত্বকে বুঝিয়ে থাকে। শেষাশেষি বিভাগ দ্বারা যাগ-যজ্ঞাদির অঙ্গ প্রধান ভাবনা নির্ণয় করা হয়। ক্রতর্থ পুরুষার্থভেদ দ্বারা প্রযুক্তি বিশেষ প্রকরণে যজ্ঞকারীর গুণ ও রীতি নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। ক্রমভেদ দ্বারা যজ্ঞাদিকর্মের ক্রম নির্ণয় এবং অধিকারী বিশেষ বলতে অধিকারী নির্ণয় বুঝিয়ে থাকে। সামান্যাতিদেশ বলতে সামান্যতঃ একধর্মের অন্যত্র আরোপ সম্পর্কিত বোঝানো হয়। অমুক অমুক কর্মের ন্যায় করতে হবে এটাই বিশেষাতিদেশ। মন্ত্রাদিতে অপ্রাপ্ত এরূপ পদার্থের উল্লেখ এবং বিচারকেই উহ বিচার বলে। কোন দ্রব্যের নির্বৃত্তি অর্থাৎ পরিহার করতে হবে এটাই বাধ-বিচার। বহুকর্মের উদ্দেশ্যে অঙ্গীভূত এক কর্মকরণই পূর্ব মীমাংসা দর্শনোক্ত তন্ত্র। এককর্মের উদ্দেশ্যে অন্যকর্মের সিদ্ধিকেই প্রসঙ্গ বলে। উপরোক্ত বিষয়গুলোই মীমাংসা দর্শনের আলোচ্য। এক কথায় বৈদিক কর্মকাণ্ড অর্থাৎ যজ্ঞের মাধ্যমে দেব-দেবীদের প্রীতিলাভ করে দেহান্তে স্বর্গাদি লোকলাভই মীমাংসা দর্শনের আলোচ্য বিষয়। জৈমিনী প্রণীত 'পূর্ব মীমাংসা সূত্র' উক্ত দর্শনের প্রামাণ্য গ্রন্থ।
৬.বেদান্ত দর্শন:- বেদান্ত দর্শনকে শারীরক মীমাংসা বা উত্তর-মীমাংসা দর্শন নামেও অভিহিত করা হয়ে থাকে। এই দর্শনে ব্রহ্মের সাথে জীবের অভিন্নতার এবং বেদাদি শ্রবণ, মনন ও নিদিধ্যাসন করে যেভাবে জীব ব্রহ্মসাক্ষাৎকার লাভ করে ব্রহ্মের সাথে একাত্মতা লাভ করে মুক্তিলাভ করে সেটাই ব্যাখ্যাত হয়েছে। বেদান্ত দর্শন মতে, ব্রহ্মই জগতের একমাত্র কারণ। যা হতে জগতের উৎপত্তি, যার মধ্যে স্থিতি এবং যার মধ্যে জগতের লয় হয়, তাই ব্রহ্ম। মহর্ষি বাদরায়ণ এই দর্শনের প্রণেতা। বেদান্ত দর্শন চারটি অধ্যায়ে বিভক্ত। প্রতিটি অধ্যায় আবার চারটি পাদ নিয়ে গঠিত।
🔸প্রথম অধ্যায়ের প্রদর্শিত বিষয় সকল প্রকার বেদান্ত বাক্যের অর্থাৎ বেদের অন্ত উপনিষদের বা দর্শনের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ আলোচ্য বিষয় হচ্ছে সর্বজ্ঞ ও সর্বশক্তিমান অদ্বিতীয় ব্রহ্ম। এই অধ্যায়ের প্রথম পাদে ব্রহ্মের বেদবর্ণিত বিশেষ লক্ষ্মণ বা বিশেষত্বগুলি আলোচিত হয়েছে। দ্বিতীয় পাদে উপাস্য ব্রহ্মের বিষয়ে, তৃতীয় পাদে ব্রহ্মের অস্পষ্ট বা দুর্বোধ্য লক্ষ্মণগুলি নিয়ে এবং চতুর্থ পাদে 'অব্যক্ত' 'অজা' ইত্যাদি অস্পষ্ট বা সন্দেহযুক্ত শব্দগুলির বিশদ ব্যাখা করা হয়েছে।
🔸দ্বিতীয় অধ্যায়ে ন্যায়, বৈশেষিক, অন্যান্য স্মৃতি ও তর্ক প্রভৃতি শাস্ত্রের সম্ভাব্য বিরোধী মতগুলো আলোচনা ও সেগুলো হতে উপস্থাপিত যুক্তিসমূহ খণ্ডন করে অদ্বিতীয় ব্রহ্মবিষয়ে বেদান্তের নিজস্ব মতটি সুপ্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে। এই অধ্যায়ের প্রথম পাদে সাংখ্য, যোগ, বৈশেষিক ও ন্যায় দর্শনের উপস্থাপিত যুক্তিগুলি আলোচনা দ্বারা খণ্ডন করে বেদান্ত মত প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে। দ্বিতীয় পাদে সাংখ্য প্রভৃতি মতের ত্রুটিগুলি প্রদর্শিত হয়েছে কেননা কোনো মত প্রতিষ্ঠিত করতে হলে নিজ বক্তব্যের স্বপক্ষে ও বিপক্ষে যে সকল বক্তব্য থাকে তা উপস্থাপন করতে হয় এবং এভাবেই আলোচ্য বস্তু সম্বন্ধে যথার্থ জ্ঞান লাভ করা যায়। অতঃপর তৃতীয় পাদে সৃষ্টি প্রভৃতি বিষয়ে যে সকল আপাত বিরোধী শ্রুতি বাক্য আছে সেগুলোর মীমাংসা এবং চতুর্থ পাদে জীবাত্মা সম্বন্ধে অর্থাৎ জীবের সূক্ষ্ম শরীর কিরূপ তা আলোচিত হয়েছে এবং ইন্দ্রিয় ও ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য বিষয়ে বেদ বাক্যে যে আপাতঃ বিরোধ আছে সেগুলোর মীমাংসা করা হয়েছে।
🔸তৃতীয় অধ্যায়ের বিষয়বস্তু হচ্ছে সাধন-নিরুপণ। এর প্রথম পাদে বৈরাগ্য উৎপাদনের জন্য পুনর্জন্ম তত্ত্ব অর্থাৎ জীবের বারংবার জন্ম ও মৃত্যুর আবর্তনে থেকে সংসারে এসে দুঃখ ভোগের বর্ণনা, দ্বিতীয় পাদে জীবের স্বরূপ ও ব্রহ্মের বিষয়ে ব্যাখ্যা, তৃতীয় পাদে ব্রহ্মবিষয়ে বেদের ভিন্ন ভিন্ন শাখায় যে সকল গুণ আরোপ করা হয় সেগুলোর উল্লেখ এবং চতুর্থ পাদে নির্গুণ ব্রহ্মবিদ্যা লাভের জন্য বর্ণাশ্রম ধর্মপালন, দান, যজ্ঞ, অধ্যয়ন প্রভৃতি বহিরঙ্গ সাধন এবং শম, দম, নিদিধ্যাসন প্রভৃতি অন্তরঙ্গ সাধনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
🔸চতুর্থ অধ্যায়ে সগুণ ও নির্গুণ বিদ্যার তুলনামূলক আলোচনা ও পরিণাম ব্যাখ্যাত হয়েছে। এর প্রথম পাদে জীবন্মুক্তির বিষয়ে অর্থাৎ দেহে অবস্থানরত জীবিত অবস্থায় ব্রহ্ম উপলব্ধি করার বিষয়ে, দ্বিতীয় পাদে মৃত্যুর পর জীবের দেহাতীত হয়ে যাওয়ার বিষয়ে, তৃতীয় পাদে সগুণ ব্রহ্মবিদ অর্থাৎ যারা ব্রহ্মের সাকার প্রকাশকে উপাসনা করে সিদ্ধ হয়েছেন তাদের গতি অর্থাৎ ক্রমমুক্তি নিয়ে এবং চতুর্থ পাদে নির্গুণ ব্রহ্মবিদ কীভাবে 'বিদেহ কৈবল্য' অবস্থা প্রাপ্ত হয়ে মুক্তিলাভ করেন তা আলোচিত হয়েছে। মহর্ষি বাদরায়ণ প্রণীত 'ব্রহ্মসূত্র' বা নামান্তরে 'শারীরক মীমাংসা' বেদান্ত দর্শনের প্রামাণ্য গ্রন্থ।
সংক্ষিপ্ত আলোচনা হওয়ায় অনেক সূক্ষ্ম বিষয়েরই বিশদ ব্যাখ্যা করতে পারলাম না। পরবর্তীতে প্রতিটি দর্শনের উপর পৃথক পৃথকভাবে লিখে প্রতিটি বিষয়ের বিশদ ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করব। লেখাটি ভগবতী মা দূর্গার চরণে সমপর্ণ করে এখানেই সমাপ্ত করছি। পাঠকগণ ভুল-ত্রুটি ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন।
তথ্যসূত্র: প্রস্থানভেদ (আচার্য মধুসূদন সরস্বতী)
✍️: অর্ক বিশ্বাস
গবেষক,সনাতন শাস্ত্র গবেষণা কমিটি
।ॐ।সত্যের সন্ধানে সনাতন।ॐ।
