প্রাচীন ভারতবর্ষের একজন অন্যতম ঋষি ছিলেন মহর্ষি কণাদ। সনাতন ধর্মের ছয়টি মূল দর্শনের একটি বৈশেষিক দর্শনের সূত্রপাত এই ঋষিবরের দ্বারাই সংঘটিত হয়েছিল। কণাদের অপর নাম ছিল উলুক। কিছু পৌরাণিক কাহিনী অনুযায়ী তণ্ডুলকণা খেয়ে জীবনধারণ করতেন বলেই ইনি 'কণাদ' নামে পরিচিত হন। প্রাচীন ভারতবর্ষের দার্শনিক অগ্রযাত্রায় মহর্ষি কণাদের ভূমিকা ছিল অনস্বীকার্য। অতি দুঃখের একটি বিষয় হলো সনাতনী সমাজের একটি বৃহৎ অংশ বর্তমানে মহর্ষি কণাদের উদ্ভাবনী কীর্তির বিষয়ে অজ্ঞ। আধুনিক বিজ্ঞানীদের যে কিছু মৌলিক তত্ত্বের উপর আধুনিক বিজ্ঞানচর্চার এত অগ্রগতি, এই সকল বৈজ্ঞানিক তত্ত্বের উদ্ভাবন বহু পূর্বেই প্রাচীন ভারতবর্ষের জ্ঞানীগুণী মুনিঋষিরা করে গিয়েছিলেন এবং এই ক্ষেত্রে মহর্ষি কণাদের একটি বড় অবদান রয়েছে। কণাদ প্রণীত বৈশেষিক দর্শনের বিষয়বস্তু সম্পর্কে যথাযথভাবে জানলে পাঠকগণ ধারাবাহিকভাবে বিষয়টি উপলব্ধি করতে পারবেন বলে মনে করি।
বৈশেষিক দর্শনের মাধ্যমে ঋষি কণাদ আমাদেরকে জগৎ-তত্ত্ব বিচারে প্রেরণা প্রদান করেন। বৈশেষিক দর্শন ১০ অধ্যায়ে বিভক্ত। প্রত্যেক অধ্যায়ে দুইটি করে আহ্নিক রয়েছে এবং সর্বমোট ৩৭০ টি সূত্র নিয়ে সম্যক দর্শন গঠিত। বৈশেষিক দর্শন প্রধানত সপ্ত পদার্থ ভিত্তিক, যা বিশ্বকে ব্যাখ্যা করতে সাহায্য করে:
১. দ্রব্য – জড় ও চেতনাসম্পন্ন বস্তু
২. গুণ – রূপ, স্বাদ, গন্ধ, স্পর্শ ইত্যাদি
৩. কর্ম – গতি বা বল
৪. সামান্য– সাধারণ বৈশিষ্ট্য
৫. বিশেষ – পৃথক সত্তার বৈশিষ্ট্য
৬. সমবায়– এক বস্তুতে অন্যটির অস্তিত্ব
৭. অভাব – অনুপস্থিতি বা শূন্যতা
এই প্রবন্ধে বৈশেষিক দর্শন হতে ঋষি কণাদের কিছু বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব সমন্বিত কীর্তি উল্লেখ করার চেষ্টা করছি যা পাঠকদের সনাতন ধর্মের মুনি-ঋষিদের মাহাত্ম্য কিছুটা উপলব্ধি করাতে ভূমিকা রাখবে।
বর্তমানে আমরা সকলেই পরমাণুর বিষয়ে অবগত রয়েছি। প্রত্যেকটি পদার্থই পরমাণু দিয়ে গঠিত এবং বিভিন্নরকম পরমাণু মিলিত হয়েই বিভিন্নরকম পদার্থের উদ্ভব হয়। এই সমস্ত বিষয় আমরা আধুনিক বিজ্ঞানের কল্যাণে জানি এবং এই সমস্ত জ্ঞানলাভ করার কারণে আমরা প্রতিনিয়তই পাশ্চাত্য বিজ্ঞানীদের ধন্যবাদ দিই। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে সহস্র বছর পূর্বে এই ভারতভূমিতেই পরমাণু নিয়ে চর্চা হয়েছিল এবং বহু মুনিঋষিই বলে গিয়েছেন যে সকল পদার্থই অন্তিমে এক প্রকার পরম অণু দিয়ে গঠিত। মহর্ষি কণাদ তাঁদের মধ্যেই একজন। মহর্ষি কণাদ তার দর্শনগ্রন্থে এটাই বুঝিয়েছেন যে জাগতিক প্রত্যেকটি বস্তুই সেই বস্তু অপেক্ষা ক্ষুদ্র অপর একটি বস্তু দ্বারা গঠিত এবং এভাবে যেকোনো বস্তুকে বিভাগ করতে করতে অবশেষে যেই ক্ষুদ্রতম অবয়বে উপস্থিত হওয়া যায়, তাইই হলো সেই পরমাণু। এই পরমাণু আবার বিভিন্ন রকমের যেমন: পার্থিব পরমাণু, জলীয় পরমাণু ইত্যাদি। এই পরমাণুই হলো সেই 'বিশেষ' পদার্থ যার থেকে 'বৈশেষিক দর্শন' নামটি এসেছে। বৈশেষিক মতে, পরম অণু নামক বিশেষ পদার্থটি হচ্ছে সৎ পদার্থ অর্থাৎ নিত্য বস্তু। পরমাণুর কোনো কারণ নেই, অর্থাৎ পরমাণু সর্বদাই বিদ্যমান এবং কারো দ্বারা সৃষ্ট নয়। সময়ের সাথে সাথে বিভিন্ন পরমাণুর সংযোজন ও বিয়োজনের মাধ্যমে জগতের সৃষ্টি ও ধ্বংস ঘটে।
সদকারণবন্নিতাম্॥
সরলার্থ:- সৎপদার্থের মধ্যে যাহার কারণ নাই, তাহাকে নিত্য বা সৎপদার্থ বলে।
(বৈশেষিক সূত্র-৪/১/১)
এই সূত্রে পরমাণুকেই কণাদ সেই নিত্য বা সৎপদার্থ হিসেবে ইঙ্গিত করেছেন। বৈশেষিক দর্শনের উপর প্রচলিত বিভিন্ন ভাষ্য ও টীকার উপর ভিত্তি করে উক্ত সূত্রের ব্যাখায় আচার্য শ্রী পঞ্চানন তর্করত্ন বলেছেন-
"পৃথিবী প্রভৃতি ভূতচতুষ্টয়ের যাহা পরম অণু—অবিভাজ্য অংশ—তাহা নিত্য; তদপেক্ষা বড় হইলেই অনিত্য।"
এই প্রসঙ্গে বৈশেষিক দর্শনের প্রশস্তপাদভাষ্যের ভাষ্যতাৎপর্যে শ্রীজগদীশ তর্কালঙ্কার উল্লেখ করেছেন-
"পরমাণুরুপ পৃথিবী নিত্য ও কার্য অর্থাৎ পরমাণুভিন্ন দ্ব্যণুকাদিরুপ সকল পৃথিবীই অনিত্য। দুইটি পরমাণু মিলিত হইয়া একটা দ্ব্যণুক উৎপন্ন হয় আবার তিনটি দ্ব্যণুক মিলিত হইয়া একটি ত্রসরেণু বা ত্রুটি উৎপন্ন হয়। এইরুপে ক্রমে মহাপৃথিবী, মহত্তর পৃথিবী ও মহত্তম পৃথিবী উৎপন্ন হইয়া থাকে, ইহার বিস্তৃত বিবরণ সৃষ্টিসংহারপ্রকরণে পাওয়া যাইবে। পরমাণু ও দ্ব্যণুকরূপ পৃথিবী প্রত্যক্ষ নহে, ত্রসরেণু হইতে প্রত্যক্ষ হইয়া থাকে।"![]()
অর্থাৎ পরমাণু পরিমাণ পৃথিবী নিত্য এবং বিভিন্ন পরমাণুর একত্রে মিলিত দ্ব্যণুক থেকে শুরু করে সম্মিলিত জগৎ অনিত্য। এখানে পরমাণুরুপ পৃথিবী বলতে পরমাণু পরিমাণ পৃথিবীর অংশ অর্থাৎ পরমাণুকেই বোঝাচ্ছে এবং এই পরমাণু নিত্য অর্থাৎ এর কোনো ধ্বংস নেই, এটি স্থায়ী বস্তু। দুইটি পরমাণু মিলিত হয়ে একটি দ্ব্যণুক উৎপন্ন হয় এবং এরকম তিনটি দ্ব্যণুক মিলিত হয়ে একটি ত্রসরেণু উৎপন্ন হয়। পরমাণু ও দ্ব্যণুক খালি চোখে প্রত্যক্ষ করা যায় না কিন্তু ত্রসরেণু থেকে পরবর্তী সকল যৌগিক পদার্থই সরাসরি প্রত্যক্ষ করা যায়। আর এভাবেই অণু-পরমাণুগুলো মিলিত হতে হতে ক্রমে জগতের উৎপত্তি হয়। নিত্য পদার্থ পরমাণু থেকে উৎপন্ন হয়েও দ্ব্যণুক থেকে শুরু করে সমগ্র জগৎ অনিত্য অর্থাৎ অস্থায়ী। কেননা তা সময়ের সাথে সংযোজিত-বিয়োজিত হয়ে নিজ অবস্থার পরিবর্তন ঘটায় এবং সমস্ত যৌগিক বস্তু প্রলয়ের সময় পুনরায় বিচ্ছিন্ন পরমাণুসমূহে পরিণত হয়। বৈশেষিক মতে, বিচ্ছিন্ন স্বাধীন পরমাণুর সংযোজন-বিয়োজন সম্ভব নয়। তাই পরমাণু নিত্য।
তস্য কার্য্যং লিঙ্গম্॥
সরলার্থ:- কার্য তাহার অনুমাপক॥
(বৈশেষিক সূত্র-৪/১/২)
কার্য দ্বারাই কারণের অনুমান করা যায়। ইংরেজিতে বললে, Every effect has a cause behind it. প্রতিটা যৌগিক বস্তকে পর্যবেক্ষণ করলে সেই যৌগিক বস্তুর কারণ হিসেবে অপেক্ষাকৃত মৌলিক বস্তুর ধারণা পাওয়া যায়। তেমনি এই বিশ্বজগতের বিভিন্ন যৌগিক বস্তু পর্যবেক্ষণ করলে এর কারণ হিসেবে অপেক্ষাকৃত মৌলিক বস্তুর সন্ধান পাওয়া যায় এবং এভাবে মৌলিকতর বস্তু হতে আরো মৌলিকতর বস্তুর সন্ধান করতে করতে অবশেষে এক বিশেষ বস্তু পরমাণুর অনুমান করা যায় যার আর বিভাজন হয় না। উক্ত সূত্রের ব্যাখ্যায় আচার্য পঞ্চানন তর্করত্ন উল্লেখ করেছেন-
"এই নিত্য সৎ পদার্থ দৃশ্য নহে, কার্য দ্বারা তাহার অনুমান করিতে হয়। এই যে বৃহৎ পৃথিবী ইহা বৃহৎ অবয়বসমূহ হইতে উৎপন্ন, সেই বৃহৎ অবয়ব স্থূল মৃৎপিণ্ড হইতে উৎপন্ন; সেই মৃৎপিণ্ড পবনবেগে সতত পরিচালিত পরমাণুর ক্রমসম্মিলনে উৎপন্ন; এই সম্মিলনকর্তাই ঈশ্বর। আমাদের সম্মুখে উর্ধ্বে- পার্শ্বে নিরন্তর পরমাণু-সমূহ বিচ্ছিন্নভাবে ঘুরিতেছে। কিন্তু কৈ, তাহারা মিলিয়া আমাদের দৃষ্টিরোধ করিতেছে না বা বৃহৎ মৃৎপিণ্ড হইয়া আমাদের মস্তকে নিপতিত হইতেছে না। ঈশ্বরের পরমাণু-সম্মিলন বিষয়ক প্রযত্ন ফলোন্মুখ হইলে তবে তাহারা মিলিত হইয়া বৃহৎ হয়, নতুবা হয় না। সুতরাং এই বৃহৎ পৃথিবী রূপ কার্য দ্বারা আমরা নিত্য পরমাণুর ও ঈশ্বরের অনুমান করিতেছি।"
অর্থাৎ নিত্যবস্তু পরমাণুকে সরাসরি দেখা যায় না। তবে এইযে আমাদের চারদিকে বৃহৎ বৃহৎ বস্তু এবং সর্বোপরি সমগ্র জগৎ এগুলো সবই নিজ অবয়বের তুলনায় অপেক্ষাকৃত ছোট অপর বস্তুর সম্মিলনে গঠিত। বৃহৎ ভূমিসকল ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র মৃৎখণ্ড সমূহের সম্মিলনে গঠিত, আবার ক্ষুদ্র মৃৎখণ্ডগুলোও তার তুলনায় ক্ষুদ্রতর মৃৎখণ্ডের সম্মিলনে গঠিত। এভাবেই ক্ষুদ্রতর হতে ক্ষুদ্রতর সকল বস্তুই যে কোনো এক ক্ষুদ্রতম অবয়ব পরম অণুর সম্মিলন দ্বারা গঠিত তার অনুমান হয়। কিন্তু এই বিভিন্ন পরম অণুগুলোর সম্মিলন ঘটে, এই সম্মিলন ঘটার পিছে কোনো এক শক্তি তো নিশ্চয়ই কাজ করে, কারণ পরমাণু অচেতন বস্তু। তাহলে সেই চেতন শক্তিটা কী? এই শক্তিই হলো ঈশ্বর। ঈশ্বরের শক্তিতেই পরমাণুগুলো একে অপরের সাথে যথাযথভাবে সম্মিলিত হয়ে সুব্যবস্থাসম্পন্ন জগতের রচনা করে।
নিত্যং পরিমণ্ডলম্॥
সরলার্থ:- পরমাণু পরিমাণকে পরিমণ্ডল কহে, উহা নিত্য॥
(বৈশেষিক সূত্র-৭/১/২০)
অর্থাৎ পরমাণুর আকার পরিমণ্ডলাকার বা গোলকাকার॥
এছাড়াও বৈশেষিক দর্শনের আরো বহু সূত্রে পরমাণুবিষয়ক তথ্য পাওয়া যায়।
আমরা প্রায় প্রত্যেকেই জানি, নিউটন আবিষ্কার করেছিলেন যে মহাকর্ষ বলের প্রভাবে পৃথিবীতে যেকোনো বস্তু সবসময় নিচের দিকে পতিত হয়। কিন্তু এই বিষয়টিও নিউটনের বহু পূর্বে কণাদ মুনি উল্লেখ করে গিয়েছিলেন।
সংযোগাভাবে গুরুতাৎ পতনম্॥
সরলার্থ:- সংযোগ অর্থাৎ পতনের প্রতিবন্ধক না থাকিলেই গুরুত্ব হেতু পতন হইয়া থাকে॥
(বৈশেষিক সূত্র-৫/১/৭)
এটি বোঝার জন্য একটি উদাহরণ ধরা যাক। গাছের সঙ্গে ফলের যতদিন সংযোগ থাকে, গুরুত্ব থাকলেও ততদিন তা নিচে পতিত হয় না, কিন্তু সেই সংযোগ না থাকলেই তা সঙ্গে সঙ্গে নিচে পতিত হয় গুরুত্বের কারণে। অর্থাৎ উর্ধ্বমুখী বল না থাকলে বস্তু সর্বদাই গুরুত্বের ফলে নিচে পতিত হবে। যাকে আমরা আধুনিককালে মহাকর্ষ বা অভিকর্ষ বলি সেটাকেই বহু পূর্বে কণাদমুনি 'গুরুত্ব' হিসেবে ব্যাখা করে গিয়েছেন।
নিউটনের যে তিনটি গতিসূত্র প্রচলিত রয়েছে, মহর্ষি কণাদ তার নিজ দৃষ্টিকোণ থেকে সেগুলো বহু পূর্বেই উল্লেখ করে গিয়েছেন-
কারণাভাবাৎ কার্য্যাভাবঃ॥
সরলার্থ:- কারণ না থাকিলে কার্য হয় না॥
(বৈশেষিক সূত্র-১/২/১)
নোদনবিশেষাভাবান্নোর্দ্ধং ন তির্য্যগগমনম্॥
সরলার্থ:- নোদনবিশেষের অভাবে উর্ধ্বগমন বা তির্যকগমন হয় না॥
(বৈশেষিক সূত্র-৫/১/৮)
কারণ ছাড়া কখনোই কোনো কার্য ঘটানো সম্ভব না। নোদন দ্বারা সেই কার্যকর শক্তিকে বোঝায় যা কোনো বস্তুর গতি পরিবর্তন করে। অর্থাৎ কার্যকরী শক্তির প্রয়োগ বা বলপ্রয়োগ না করলে কোনো বস্তুর উপরে বা নিচে কোনো প্রকার গতি সম্ভব হয় না। নিউটনের প্রথম সূত্রের সাথে এই ধারণা অনেকটাই মিলে যায়। নিউটন বলেছিলেন, বাহ্যিক বলের অভাবে স্থির বস্তু স্থিরই থাকে এবং গতিশীল বস্তু চিরকাল গতিশীল থাকে।
নিউটনের দ্বিতীয় সূত্র মূলত বল ও গতির পারস্পরিক সম্পর্ক নির্দেশ করে। কোনো বস্তুর গতির পরিবর্তন সেই বস্তুতে প্রয়োগ করা বলের উপর নির্ভরশীল। এরকম একই ধারণা বৈশেষিক দর্শনেও পাওয়া যায়। মহর্ষি কণাদ শরনিক্ষেপের উদাহরণ দিয়ে বল ও গতির সম্পর্ক প্রতিপাদন করে দেখিয়েছেন।
নোদনাদাদ্যমিষোঃ কর্ম্ম তৎকর্ম্মকারিতাচ্চ সংস্কারাদুত্তরং তথোত্তরঞ্চ॥
সরলার্থ:- শরের প্রথম কর্ম নোদননামক সংযোগ হইতে উৎপন্ন হয়; ঐ প্রথম কর্মের জন্য বেগনামক সংস্কারে পরবর্তী কর্ম উৎপন্ন হয়; এইরূপ উত্তরোত্তর জানিবে॥
(বৈশেষিক সূত্র-৫/১/১৭)
অর্থাৎ শরনিক্ষেপের সময় বাহ্যিক বলের প্রভাবে বেগ উৎপন্ন হয় এবং এর মাধ্যমেই শরের মধ্যে গতির সৃষ্টি হয়, আর বেগের মাধ্যমেই শর পরবর্তীতে গতিশীল হতে থাকে। এখানে কর্ম বলতে গতিশীল অবস্থাকেই বুঝতে হবে।
নিউটনের তৃতীয় সূত্রটি হচ্ছে- প্রত্যেক ক্রিয়ার একটি সমান ও বিপরীত প্রতিক্রিয়া থাকে। গাণিতিকভাবে দেখলে, প্রতিটি বল প্রয়োগের সাথে সাথে বিপরীত দিকে অপর একটি বল এসে পূর্বের বলকে প্রশমিত করে। ঋষি কণাদ যেভাবে বিষয়টি উপস্থাপন করেছেন তা হলো:-
কার্য্যবিরোধি কর্ম্ম॥
সরলার্থ:- কর্ম, কর্ম দ্বারা বিনষ্ট হয়।
(বৈশেষিক দর্শন-১/১/১৪)
অর্থাৎ একটি কর্ম বা ক্রিয়া তার প্রতিক্রিয়া অর্থাৎ অপর একটি কর্ম দ্বারাই বিনষ্ট বা প্রশমিত হয়।
পৃথিবীর আকস্মিক ক্রিয়া বা ভূমিকম্পের কারণও বৈশেষিক দর্শনে পাওয়া যায়।
নোদনাভিঘাতাৎ সংযুক্তসংযোগাচ্চ পৃথিব্যাং কর্ম্ম॥
সরলার্থ:- নোদন (বল), অভিঘাত (বৃহৎ সংঘর্ষ) এবং সংযুক্ত-সংযোগ (ভূ-গর্ভস্থ বিভিন্ন স্তরের একে অপরের সঙ্গে সংযুক্ত-সংযোগের ঘটনা) পৃথিবীতে কর্ম (এই প্রসঙ্গে কর্ম অর্থে স্পন্দনক্রিয়া) হইবার কারণ॥
(বৈশেষিক সূত্র-৫/২/১)
বৃষ্টিপাতের কারণ সূর্যকর্তৃক যে জলের বাষ্পীয়করণ প্রক্রিয়া সে সম্পর্কেও মহর্ষি কণাদ উল্লেখ করেছেন:-
নাড্যো বায়ুসংযোগাদারোহণম্॥
সরলার্থ:- সূর্যরশ্মিসমূহ বায়ু-সংযোগ সাহায্যে সেই জলকে উর্ধ্বে আরোহণ করাইয়া থাকে॥
(বৈশেষিক সূত্র-৫/২/৫)
জলের বরফে পরিণত হওয়া এবং পুনরায় বরফ হতে জলে পরিণত হওয়ার সাথ তাপের সম্পর্কের বিষয়টিও মহর্ষি কণাদ স্পষ্ট উল্লেখ করেছেন।
অপাং সংঘাতো বিলয়নঞ্চ তেজঃসংযোগাৎ॥
সরলার্থ:- জলের সংঘাত অর্থাং জমাট এবং বিলয়ন (গলে যাওয়া) অর্থাৎ দ্রবীভাব তেজ (তাপ) সংযোগমূলক॥
(বৈশেষিক সূত্র-৫/২/৮)
মেঘগর্জনের কারণ সম্পর্কে বলা হচ্ছে-
তত্র বিস্ফূর্জথুর্লিঙ্গম্॥
সরলার্থ:- বজ্রনির্ঘোষ সেই তেজঃসংযোগের অনুমাপক॥
(বৈশেষিক সূত্র-৫/২/৯)
উক্ত সূত্রের ব্যাখায় আচার্য পঞ্চানন তর্করত্ন বিস্তারিত বলেছেন- "যেরূপ তাপ হইলে, জল সংঘাত অবস্থা প্রাপ্ত হইয়া কঠিনাকৃতি হয় এবং যেরুপ তাপ হইলে, জল সংঘাতবস্থা বা বাষ্প হইতে দ্রবীভূত হইয়া থাকে, সেই বিভিন্নপ্রকারে তাপযুক্ত শীত ও উষ্ণ বস্তুদ্বয় পরস্পর সংযুক্ত হইয়া সন্নিহিত মেঘে বা বায়ুতে যে তড়িৎ উৎপন্ন করে, তাহা ঐ শীতোষ্ণ বস্তুদ্বয়ের তড়িদ্ভাগের সহিত সম্মিলন হইবার পথে জলাদি দ্বারা বাধা প্রাপ্ত হইলেই বজ্রনির্ঘোষ (মেঘগর্জন) হয়। সুতরাং বজ্রধ্বনি যে বিভিন্নরূপ তাপসংযোগের অনুমাপক ইহা বেশ বুঝা গেল।"
এপর্যন্ত পড়ার পর পাঠকগণ নিশ্চয়ই মহর্ষি কণাদের সূক্ষ্ম ও গভীর দৃষ্টি সম্পর্কে কিছুটা হলেও নিশ্চয়ই উপলব্ধি করতে পেরেছেন বলে আশা করি। উল্লেখিত বিষয়গুলো ছাড়াও আরো বহু গূঢ় বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব সমন্বিত বিষয় বৈশেষিক দর্শনে উপলব্ধ রয়েছে। আর ঋষি কণাদের মতোই অসংখ্য মুনি-ঋষিদের প্রণীত জ্ঞানেই সনাতন ধর্ম সমৃদ্ধ। প্রবন্ধটি ভগবতীর চরণে সমর্পণ করে এখানেই সমাপ্ত করছি। পাঠকগণ ভুল-ত্রুটি ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। ধন্যবাদ।
🖊️অর্ক বিশ্বাস
গবেষক, সনাতন শাস্ত্র গবেষণা কমিটি
।ॐ।সত্যের সন্ধানে সনাতন।ॐ।






