যেখানে অন্য সম্প্রদায়ের লোকেরা নিজেদের ধর্মগ্রন্থের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বিষয়কে বিজ্ঞানের সাথে জোড় করে মেলানোর চেষ্টা করে, সেখানে আমাদের প্রাচীন গ্রন্থে সুস্পষ্ট ও সুবিস্তারিতভাবে বিভিন্ন বিজ্ঞানসম্মত বিষয়ে আলোচনা থাকলেও গ্রন্থগুলো আমাদের দ্বারা অতি অবহেলিত হওয়ায় আমরা সেগুলো অবগত থাকি না। আজ সনাতন শাস্ত্র থেকে এমনি একটি বিজ্ঞানসম্মত বিষয় উপস্থাপন করতে যাচ্ছি। উপস্থাপনার বিষয় হচ্ছে- সনাতন শাস্ত্রে ভ্রূণবিদ্যা। মাতৃগর্ভে একটি শিশুর কী করে উৎপত্তি হয়, বিকাশ হয় এবং শিশুটি কী করে ভূমিষ্ঠ হয় এ ব্যাপারে আমাদের প্রাচীন গ্রন্থে সুবিস্তারিত বর্ণনা দেখতে পাওয়া যায়। সেগুলো দেখার পূর্বে আধুনিক বিজ্ঞান মাতৃগর্ভে শিশুর উৎপত্তি ও বিকাশ সম্পর্কে কী বলে তা দেখে নেওয়া যাক। ইন্টারনেটে বিভিন্ন সাইটে ও রিসার্চ পেপারে মাতৃগর্ভে ভ্রূণের বিকাশ সম্পর্কে অনেক তথ্য পাওয়া যায়। সেগুলোর মধ্য থেকে সংক্ষেপে কিছু তথ্য আপনাদের সামনে উপস্থাপন করছি -
আধুনিক বিজ্ঞানের কল্যাণে আমরা সকলেই জানি পুরুষ দেহের শুক্রাণু ও নারীদেহের ডিম্বাণুর মিলন অর্থাৎ নিষেক হতেই মূলত একটি নতুন জীবন উৎপত্তির সূচনা হয়। নির্দিষ্ট শুক্রাণু ও ডিম্বাণুর মিলনে নিষেক প্রক্তিয়ায় জাইগোট উৎপন্ন হয় আর এই জাইগোট জরায়ুর অভিমুখে যাত্রা শুরু করে। জাইগোট তৈরির সাধারণত ১-২ দিন পর কোষ বিভাজন শুরু হয়। কোষ বিভাজন দ্রুত চলতে থাকে এবং একসময় এটি বহুকোষী নিরেট গোলকে পরিণত হয়, যার নাম মরুলা। মরুলার কোষগুলি একস্তরে সজ্জিত হয়ে (ব্লাস্টুলা দশায়) ব্লাস্টোসিস্টে পরিণত হয়। জাইগোট হতে ব্লাস্টোসিস্টে পরিণত হতে সময় লাগে ৪-৫ দিন।ব্লাস্টোসিস্ট জরায়ুতে পৌঁছে জরায়ুর প্রাচীরে সংযুক্ত হয় এবং এরপর থেকে ১০ সপ্তাহের মধ্যে ভ্রূণের বৃদ্ধি বা বিকাশ হতে থাকে। প্রথমদিকে অঙ্গ, দেহ ও স্নায়ুতন্ত্রের কাঠামো তৈরি হতে থাকে এবং ধারাবাহিকভাবে আঙ্গুল, চোখ, মুখ ও কান উৎপন্ন হতে শুরু করে। গর্ভধারণের পর ৪র্থ সপ্তাহ হতে হৃৎপিণ্ড, রক্তনালি, রক্ত ও অন্ত্রের উৎপত্তি শুরু হয়। ৫ম সপ্তাহে মস্তিষ্কের বিকাশ ঘটে এবং ৬ষ্ঠ সপ্তাহে চোখ এবং কানের গঠন শুরু হয়। দ্বাদশ সপ্তাহে শিশুর লিঙ্গ সহ সকল অঙ্গ গঠন প্রাথমিকভাবে সম্পন্ন হয়। ৩০ সপ্তাহের পর শিশুর মস্তক নিজ উদরমুখী হয়ে মাতৃগর্ভের নিচের দিকে চলে আসে এবং ভূমিষ্ঠ হওয়ার প্রস্তুতি নিতে থাকে। এই ছিলো আধুনিক বিজ্ঞান অনুযায়ী মাতৃগর্ভে ভ্রূণের বিকাশ ও ভ্রূণ হতে পূর্ণাঙ্গ মানবশিশু উৎপত্তি সম্পর্কিত তথ্যাবলি।
এবার আমরা দেখব আমাদের সনাতন ধর্মের অন্যতম পুরাণ গ্রন্থ শ্রীমদ্ভাগবত মহাপুরাণের(বিষ্ণু ভাগবত পুরাণ) ৩য় স্কন্ধের ৩১শ অধ্যায়। এই অধ্যায় পর্যবেক্ষণ করলে দেখতে পাওয়া যায় অধ্যায়ের শুরু হতেই ভগবান কপিল(বিষ্ণুবতার) তাঁর মাতা দেবহুতির নিকট ভ্রূণতত্ত্ব আলোচনা করছেন। নিম্নে ধারাবাহিকভাবে ভ্রূণতত্ত্ব সম্পর্কিত শ্লোক গুলো সরলার্থ সহ উল্লেখ করছি:-
শ্রীভগবানুবাচ
কর্মণা দৈবনেত্রেণ জন্তর্দেহোপপত্তয়ে।
স্ত্রিয়াঃ প্রবিষ্ট উদরং পুংসো রেতঃ কণাশ্রয়ঃ॥ (১ম শ্লোক)
সরলার্থ:- শ্রীভগবান বললেন— হে মাতা! জীবের যখন মনুষ্য-প্রজাতিতে জন্মগ্রহণের সময় হয়, তখন ঈশ্বরের প্রবর্তনায় নিজ পূর্বকর্মানুসারে দেহপ্রাপ্তির জন্য পুরুষের শুক্রকণা আশ্রয় করে নারীর উদরে প্রবেশ করে থাকে॥
কললং ত্বেকরাত্রেণ পঞ্চরাত্রেণ বুদ্বুদম্।
দশাহেন তু কর্কন্ধুঃ পেশ্যণ্ডং বা ততঃ পরম্॥ (২য় শ্লোক)
সরলার্থ:- ওই বীর্য গর্ভে প্রবিষ্ট হয়ে একরাত্রে (প্রথম রাত্রে) স্ত্রীর শোণিতের সাথে কলল অর্থাৎ মিশ্রণ হয়, এই অবস্থায় পাঁচ রাত্রি পরে সেটি বুদ্বুদাকার (গোলাকার) ধারণ করে, দশ দিনে কুলফলের মতো কিছুটা শক্ত হয় এবং তারপরে মাংসপেশি অর্থাৎ মাংসপিণ্ডের আকার অথবা অণ্ডজ প্রাণিদের বেলায় অণ্ডরুপে পরিণত হয়॥
মাসেন তু শিরো দ্বাভ্যাং বাহ্বঙ্ঘ্রাদ্যঙ্গবিগ্রহঃ।
নখলোমাস্থিচর্মাণি লিঙ্গচ্ছিদ্রোদ্ভবস্ত্রিভিঃ॥ (৩য় শ্লোক)
সরলার্থ:- একমাস পরে তার মস্তক, দুইমাসে হাত-পা ইত্যাদি অঙ্গবিভাগ এবং তিনমাসে নখ, লোম, অস্থি, চর্ম এবং স্ত্রীপুরুষ চিহ্ন ও অন্যান্য ছিদ্র সকল উৎপন্ন হয়॥
চতুর্ভির্ধাতবঃ সপ্ত পঞ্চভিঃ ক্ষুত্তৃডুদ্ভবঃ
ষড়্ভির্জরায়ুণা বীতঃ কুক্ষৌ ভ্রাম্যতি দক্ষিণে॥ (৪র্থ শ্লোক)
সরলার্থ:- চারমাসে (ত্বক, মাংস, রক্ত, মেদ, মজ্জা, অস্থি ও শুক্র) সপ্তধাতু উৎপন্ন হয়, পঞ্চম মাসে ক্ষুধা-তৃষ্ণার উদ্ভব হয় এবং ষষ্ঠ মাসে জরায়ু দ্বারা বেষ্টিত হয়ে দক্ষিণ কু্ক্ষিতে পরিভ্রমণ করতে থাকে॥
মাতুর্জগ্ধান্নপানাদ্যৈরেধদ্ধাতুরসম্মতে।
শেতে বিণ্মূত্রয়োর্গর্তে স জলর্জন্তুসম্ভবে॥ (৫ম শ্লোক)
সরলার্থ:- সেই সময় মাতৃভুক্ত অন্নপানাদি দ্বারা তার সপ্ত ধাতুর পুষ্টি সাধন হতে থাকে এবং কৃমিসমূহের উৎপত্তিস্থান ও অনভিলষিত জঘন্য বিষ্ঠামূত্রের মধ্যে তাকে শুয়ে থাকতে হয়॥
কৃমিভিঃ ক্ষতসর্বাঙ্গঃ সৌকুমার্যাৎ প্রতিক্ষণম্।
মূর্চ্ছামাপ্নোত্যুরুক্লেশস্তত্রত্যৈঃ ক্ষুধিতৈর্মুহুঃ॥ (৬ষ্ঠ শ্লোক)
সরলার্থ:- তার শরীর তখন খুবই কোমল থাকে। ফলে যখন সেখানকার কৃমি-কীটগণ ক্ষুধার্ত হয়ে সেই কোমল দেহের দংশন করে তখন ক্ষতবিক্ষত এবং অত্যন্ত যাতনাযুক্ত হয়ে ক্ষণে ক্ষণে সে মূর্ছা যেতে থাকে॥
উল্বেন সংবৃতস্তস্মিন্নন্ত্রৈশ্চ বহিরাবৃতঃ
আস্তে কৃত্বা শিরঃ কুক্ষৌ ভুগ্নপৃষ্ঠশিরোধরঃ॥ (৮ম শ্লোক)
সরলার্থ:- সেই জীব তখন মাতৃগর্ভে জরায়ু পরিবেষ্টিত এবং শিরা-উপশিরার দ্বারা আবৃত থাকে। শিশু তার মাথাটি নিজের উদরের কাছে রেখে বক্রপৃষ্ঠ ও বক্রগ্রীব হয়ে অবস্থান করে॥
আরভ্যঃ সপ্তমান্মাসাল্লব্ধবোধোহপি বেপিতঃ
নৈকত্রাস্তে সূতিবাতৈর্বিষ্ঠাভূরিব সোদরঃ॥ (১০ম শ্লোক)
সরলার্থ:- সপ্তম মাসের প্রারম্ভেই তার জ্ঞানশক্তিরও উন্মেষ হয়, কিন্তু প্রসব বায়ুর দ্বারা পরিচালিত হওয়ায় উদরে অবস্থিত কৃমি-কীটাদির ন্যায় সে এক জায়গায় স্থির থাকতে পারে না॥
কপিল উবাচ
এবং কৃতমতির্গর্ভে দশমাস্যঃ স্তবন্নৃষিঃ।
সদ্যঃ ক্ষিপত্যবাচীনং প্রসূত্যৈ সূতিমারুতঃ॥
সরলার্থ:- কপিলদেব বললেন- হে মাতা! দশমাসবয়স্ক ওই জীব গর্ভেই যখন এইভাবে বিবেকসম্পন্ন হয়ে ভগবানের স্তুতি করে (উল্লেখ্য কপিলদেব ও অন্যান্য মুনি-ঋষিদের মতে প্রতিটি গর্ভস্থ শিশুই পূর্ণাঙ্গভাবে দেহ গঠিত হওয়ার পর পূর্ব পূর্ব জন্মগুলোর স্মৃতিপ্রাপ্ত হয় এবং সেগুলো স্মরণ হওয়ার কারণে বারংবার জন্ম-মৃত্যুর চক্র হতে রেহাই পাওয়ার জন্য গর্ভে থেকেই মনের মধ্যে ঈশ্বরের স্তুতি করে। এই বিষয় আমাদের আলোচ্য প্রসঙ্গবিরোধী হওয়ায় এটা নিয়ে এখানে আলোচনা করা হলো না,তবে কারো জানার ইচ্ছা থাকলে অবগত করার অনুরোধ থাকবে,তাহলে পরবর্তীতে এই বিষয়েও আলোচনা করা হবে।), তখন সেই অধোমুখ শিশুকে প্রসববায়ু ভূমিষ্ঠ করবার জন্য নিচের দিকে পরিচালিত করতে থাকে॥
তেনাবসৃষ্টঃ সহসা কৃত্বাবাক্ শির আতুরঃ।
বিনিষ্ক্রামতি কৃচ্ছ্রেণ নিরুচ্ছ্বাসো হতস্মৃতিঃ॥ (২৩শ শ্লোক)
সরলার্থ:- সহসা সেই বায়ুকর্তৃক চালিত হওয়াতে সেই শিশু অত্যন্ত ক্লিষ্ট হয়ে মস্তকটি অধোমুখ করে অতিকষ্টে মাতৃগর্ভ থেকে নির্গত হয়। সেই সময় তার শ্বাসপ্রশ্বাস বন্ধ হয়ে যায় এবং পূর্বস্মৃতি লুপ্ত হয়ে যায়॥
পতিতো ভুব্যসৃঙ্মূত্রে বিষ্ঠাভূরিব চেষ্টতে।
রোরূয়তি গতে জ্ঞানে বিপরীতাং গতিং গতঃ॥ (২৪শ শ্লোক)
সরলার্থ:- ভূমিষ্ঠ হয়ে সেই জীব শোণিত মূত্রান্বিত কলেবরে কৃমির মতো অঙ্গসঞ্চালন করে। গর্ভবাস দশার সমস্ত জ্ঞান তার নষ্ট হয়ে যায় এবং বিপরীত গতি(দেহাভিমানরুপ অজ্ঞান অবস্থা) প্রাপ্ত হয়ে পুনঃপুন তীব্রভাবে কাঁদতে থাকে॥
অতএব আমরা দেখতে পাচ্ছি,যেই আধুনিক সময়ে এসে আমরা মাতৃগর্ভে ভ্রূণের বিকাশ সম্পর্কে বিজ্ঞানের অগ্রগতিতে জানতে পেরেছি তা বহু প্রাচীনকালেই ভারতীয় উপমহাদেশে চর্চার বিষয় হয়েছিল। সূক্ষ্ম পর্যবেক্ষণ করলে বোঝা যায় শ্রীমদ্ভাগবত মহাপুরাণে উল্লেখিত এই ভ্রূণবিদ্যা অনেকাংশেই আধুনিক ভ্রূণবিদ্যার সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ। পরবর্তী পর্বে আমরা আরেকটি প্রাচীন গ্রন্থ কৃষ্ণ যজুর্বেদীয় গর্ভ উপনিষদ হতে ভ্রণবিদ্যা বিষয়ক তথ্য পর্যবেক্ষণ করে বিস্তারিত আলোচনা করব। পরবর্তী পর্বের আমন্ত্রণ জানিয়ে আজকের পর্বটি পরমেশ্বর শ্রীনারায়ণের চরণে সমর্পিত করে এখানেই শেষ করছি। ভুল-ত্রুটি ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখার অনুরোধ থাকবে। সকলকে এই পর্যন্ত পড়ার জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ।
🖋️অর্ক বিশ্বাস
গবেষক, সনাতন শাস্ত্র গবেষণা কমিটি
।ॐ।সত্যের সন্ধানে সনাতন।ॐ।

তথ্যসমৃদ্ধ লেখা
উত্তরমুছুনAr poroborti kono porbo acha.
উত্তরমুছুনহ্যাঁ আছে, একই নামে পর্ব ছাড়া সার্চ দিন
মুছুন