প্রকৃতি পরম গুরু-৪র্থ পর্ব

 


পূর্বের পর্বগুলোতে আমরা প্রকৃতির উপাদান পৃথিবী, বায়ু, আকাশ, জল, অগ্নি, চন্দ্র, সূর্য এবং কপোত হতে শিক্ষণীয় বিষয় সম্বন্ধে জেনেছি। এই পর্বে জানবো অজগর, সমুদ্র, পতঙ্গ, ভ্রমর, মৌমাছি, হস্তী, মধু সংগ্রাহক, হরিণ ও মৎস্যের মাধ্যমে প্রকৃতি আমাদের কী শিক্ষা দিয়ে থাকে।


অবধূত দত্তাত্রেয় বলতে লাগলেন- "রাজন্! প্রাণীকুলের অনিচ্ছা, চেষ্টাচরিত্র না করা ও প্রতিরোধ করা সত্ত্বেও যেমন পূর্বকর্মানুসারে দুঃখের ভোগ হয় তেমনভাবেই স্বর্গে অথবা নরকে যেখানেই থাকুক না কেন ইন্দ্রিয়ানুভূত সুখও প্রাপ্তি হয়। অতএব সুখ-দুঃখের রহস্য জানা বুদ্ধিমান ব্যক্তির পক্ষে উচিত হল, সে যেন তার জন্য ইচ্ছা বা প্রচেষ্টা আদপেই না করে। যাচনা ব্যতিরেকে, কামনা না রেখে অনায়াসে যা পাওয়া যায় তা শুষ্ক, মধুর, আস্বাদযুক্ত অথবা কম-বেশি যাই হোক না কেন, অজগর বৃত্তির ন্যায় বুদ্ধিমান পুরুষের সবেতে উদাসীন থেকে তার দ্বারাই জীবন-ধারণ করা উচিত। অজগর খাদ্য সমাপ্ত না হলে তার আহরণের চেষ্টা করে না ; বহুদিন সে অনাহারেই কাটিয়ে দেয়। অজগর বৃত্তি ধারণ করা ব্যক্তি খাদ্যের অপ্রাপ্তিকে প্রারব্ধ ভোগ জ্ঞান করবে এবং বিনা প্রচেষ্টায় স্বতপ্রাপ্ত আহারে সন্তুষ্ট থাকবে।

শরীরের মনোবল, ইন্দ্রিয়বল ও দেহবল থাকলে সে যেন নিশ্চেষ্ট থাকে। দেহ ইন্দ্রিয়াদিতে নিদ্রার ভাব না থাকলেও যেন নিদ্রাবস্থায় কালাতিপাত করে; কর্মেন্দ্রিয়ের ব্যবহারে বিরত থাকে। রাজন্! আমি অজগর থেকে এই শিক্ষাই গ্রহণ করেছি। (অজগর যেরুপ দেহ ও ইন্দ্রিয় সক্রিয় থাকলেও নিদ্রিত প্রাণীর ন্যায় অবস্থান করে, সাধক ব্যক্তিরও সেরুপ দেহ ও ইন্দ্রিয়তে বিষয় সুখলাভের জন্য বল থাকলেও তিনি তা প্রয়োগ না করে নিষ্ক্রিয় অবস্থায় থাকবেন এটাই শিক্ষা।)


সমুদ্রের কাছ থেকে আমি এই শিক্ষা গ্রহণ করেছি যে, সাধক ব্যক্তির সর্বদা প্রসন্ন চিত্ত ও গম্ভীর থাকা উচিত; তার ভাব গভীর, অপার এবং অসীম হওয়া কাম্য এবং কোনো কারণেও তার মধ্যে ক্ষোভের আগমন হওয়া ঠিক নয়। সে জোয়ার-ভাটা, তরঙ্গরহিত শান্ত সমুদ্রবৎ থাকবে। দেখো! সমুদ্র বর্ষাকালে নদীতে বন্যার কারণে স্ফীত আর গ্রীষ্মকালে সংকুচিত হয় না। তেমনভাবেই ভগবৎপরায়ণ সাধকেরও জাগতিক পদার্থ প্রাপ্তিতে উল্লসিত আর ক্ষয়ে বিষণ্ণ হওয়া উচিত নয়৷


রাজন্! আমি পতঙ্গের কাছ থেকেও শিক্ষা গ্রহণ করেছি। পতঙ্গ রূপে মুগ্ধ হয়ে অগ্নিতে ঝাঁপ দেয় এবং পুড়ে ছারখার হয়ে যায়। তেমনভাবেই ইন্দ্রিয়গণকে বশীভূত রাখতে অসমর্থ ব্যক্তি নারী-দেহ দর্শনেই তাতে আসক্ত হয়ে পড়ে এবং ঘোর অন্ধকারে, নরকে অধঃপতিত হয়ে নিজের সর্বনাশ ডেকে আনে। সত্যই নারী দেবতাদের সেই মায়া যার জন্য জীব ভগবান বা মোক্ষপ্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত হয়ে যায়। যে মূঢ় ব্যক্তি কামিনী-কাঞ্চন পোষাক-অলংকার আদি বিনাশশীল ভ্রমাত্মক পদার্থে আসক্ত এবং সেগুলির উপভোগের জন্য লালায়িত, সে ক্রমে নিজ বিবেকবুদ্ধি হারিয়ে পতঙ্গবৎ ধ্বংস হয়ে যায়।


রাজন ! সন্ন্যাসীর উচিত যে, সে গৃহস্থগণকে যেন কোনো রকম উত্যক্ত না করে ভ্রমরবৎ নিজ জীবন নির্বাহ করে। তার মাধুকরী একাধিক গৃহ থেকে হওয়াই বাঞ্ছনীয়। (নচেৎ পদ্মফুলের গন্ধে আসক্ত হয়ে তার রস সংগ্রহে মত্ত ভ্রমর যেমন পদ্মপাপড়িতে বন্ধ হয়ে বিনষ্ট হয়, তেমনই কোনো বিশেষ গৃহস্থের অন্ন নিত্য গ্রহণ করলে সন্ন্যাসী জাগতিক মোহে লিপ্ত হয়ে যেতে পারে।) ভ্রমর যেমন ফুলের ছোট-বড় বিচার না করে, সকল ফুলের সার আহরণ করে, তেমনভাবেই বুদ্ধিমান ব্যক্তির উচিত হল যে, ছোট-বড় বিচার না করে সকল শাস্ত্র থেকে সারকথা গ্রহণ করবে।


রাজন্ ! আমি মৌমাছির কাছে এই শিক্ষা পেয়েছি যে সন্ন্যাসীর পক্ষে সায়ংকাল অথবা আগামীকাল হেতু ভিক্ষা পরিরক্ষণ অনুচিত। তার ভিক্ষাপাত্র শুধুমাত্র হাত ও সংগ্রহ পাত্র উদর হওয়াই কাম্য। সে সঞ্চয়ে রত হলে তার জীবন মৌমাছির মতন দুঃসহ হয়ে উঠবে। এই কথা উত্তমরূপে জেনে নেওয়া দরকার যে, সন্ন্যাসী কখনো পরবর্তী সময়ের (দুপুর হলে রাতের এবং রাত্রি কালে পরবর্তী দিনের) জন্য কিছুই সংগ্রহ করবে না। যদি সংগ্রহ করে তাহলে মৌমাছির মতন সংগ্রহের বস্তুসহ সে প্রাণও হারাতে পারে।


রাজন্! আমি হস্তীর কাছে এই শিক্ষা গ্রহণ করেছি যে, সন্ন্যাসীর কাষ্ঠনির্মিত নারীর স্পর্শ করাও অনুচিত। গর্তের উপর রাখা নকল হস্তিনীর সঙ্গ পেতে যেমন হস্তী গর্তে পড়ে ধরা পড়ে যায়, সেইভাবেই নারীর স্পর্শ সন্ন্যাসীকে মায়ার বন্ধনে আবদ্ধ করে ছাড়ে। বিবেকী পুরুষ কোনো নারীকে কখনো যেন ভোগ্যবস্তু রূপে স্বীকার না করে; কারণ নারী তার পক্ষে মূর্তিমান মৃত্যুস্বরূপ। যেমন বলবান হস্তী অন্য হস্তীর কাছ থেকে হস্তিনীকে কেড়ে নিয়ে সেই হস্তীকে বধ করে, তেমনি তারও মৃত্যু অনিবার্য।


আমি মধু সংগ্রহকারী ব্যক্তির কাছে এই শিক্ষা গ্রহণ করেছি যে, জগতে লোভী পুরুষরা কত কষ্ট করে ধন সঞ্চয় করে থাকে। তারা সঞ্চিত ধন অন্যদের দানও করে না আবার নিজেরাও ভোগ করে না। যেমন মধু সংগ্রহকারী, মৌমাছির সঞ্চিত মধু কেড়ে নিয়ে যায় সেইরূপ ধনী ব্যক্তিদের সঞ্চিত ধনের একই অবস্থা হয় ; তার উপর লক্ষ্য রাখা অন্য কোনো ব্যক্তি তা ভোগ করে থাকে। তুমি অহরহই তো দেখছ যে মধু সংগ্রহকারী মৌমাছিদের সংগ্রহ করা মধু তাদের ভোগের পূর্বেই অন্যেরা কেড়ে নিয়ে যায়; ঠিক সেইভাবেই গৃহস্থের

অতি কষ্টের সঞ্চিত ধন—যাদের থেকে সে সুখ ভোগের অভিলাষ করে তারা এবং সন্ন্যাসী ব্রহ্মচারীদের সেবায় খরচ হয়ে যায়। (কারণ গৃহস্থ, অতিথি অভ্যাগত সকলের সেবা করে তবে নিজে তা গ্রহণ করে থাকে)।


আমি হরিণের কাছেই এই শিক্ষা গ্রহণ করেছি যে, বনবাসী সন্ন্যাসীর কখনো বিষয়-সম্পত্তির গুণগান শোনা ঠিক নয়। কারণ ব্যাধের সংগীতে মোহিত হয়ে হরিণ ব্যাধের ফাঁদে পড়ে যেমন প্রাণ হারায় তেমনই সেই সন্ন্যাসীদের দুর্গতি হয়। তুমি তো জানই যে হরিণের গর্ভজাত ঋষ্যশৃঙ্গ মুনি নারীদের গীত-বাদ্য-নৃত্যে বশীভূত হয়ে তাদের হাতের

পুতুল হয়ে পড়েছিলেন।


এইবার আমি তোমাকে মৎস্যর কাছ থেকে পাওয়া শিক্ষার কথা বলছি। মৎস্য টোপে গাঁথা মাংস খণ্ডের লোভে নিজের প্রাণ দেয়। তেমনভাবেই স্বাদলোভী কুমতি ব্যক্তিগণ মনকে চাঞ্চল্য প্রদানকারী নিজ জিহ্বার বশীভূত হয়ে পড়ে ও তাতেই নিজ প্রাণ হারায়। বিবেকী ব্যক্তি খাদ্যবস্তুতে সংযম করে অন্য ইন্দ্রিয়দের অতি শীঘ্রই বশীভূত করে কিন্তু তাতে তার রসনা-ইন্দ্রিয় বশীভূত হয় না। রসনা-ইন্দ্রিয়কে তার আহার্য থেকে বিরত রাখলে তা আরও প্রবল হতে দেখা

যায়। যতক্ষণ পর্যন্ত রসনেন্দ্রিয় বশীভূত না হয় ততক্ষণ অন্য সকল ইন্দ্রিয় বশীভূত হলেও মানুষ জিতেন্দ্রিয় হতে পারে না। যেই রসনেন্দ্রিয় বশীভূত হয়ে গেল তখন ধরা যেতে পারে যে সকল ইন্দ্ৰিয় বশীভূত হল।"


চতুর্থ পর্ব এখানেই শেষ করছি। পরবর্তী পর্ব শীঘ্রই আসছে। শেষ পর্যন্ত যারা পড়েছেন তাদেরকে অসংখ্য ধন্যবাদ।


তথ্যসূত্র:- শ্রীমদ্ভাগবত পুরাণ 


✍️:অর্ক বিশ্বাস

গবেষক, সনাতন শাস্ত্র গবেষণা কমিটি

।ॐ।সত্যের সন্ধানে সনাতন।ॐ।


পরবর্তী পর্ব দেখতে ক্লিক করুন

পূর্ববর্তী পর্ব দেখতে ক্লিক করুন


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নবীনতর পূর্বতন



ধর্মীয় বাণী/উপদেশ

"দেবী! তুমি স্বাহা, তুমি স্বধা এবং তুমিই বষটকার। স্বরও তোমারই স্বরূপ। তুমিই জীবনদায়িনী সুধা। নিত্য অক্ষর প্রণবের অকার, উকার, মকার-এই তিনমাত্রারূপে তুমিই স্থিত, আবার এই তিন মাত্রা ছাড়া বিন্দুরূপা যে নিত্য অর্দ্ধমাত্রা-যাকে বিশেষরূপে আলাদাভাবে উচ্চারণ করা যায় না, তাও তুমিই। " (শ্রী শ্রী চন্ডীঃ ১/৭৩-৭৪)