আর্য সমাজের একজন সুপরিচিত আচার্য্য ব্রহ্মমুনি রচিত মহাভারত কী বিশেষ শিক্ষায়েঁ গ্রন্থের ১৫৯ ও ১৬০ পৃষ্ঠায় রয়েছে -
১) "কৃষ্ণ কা পত্নী সত্যভামা ঔর রুকষমিনী (রুক্ষিণী) থা না কি রাধা ?" - এটা ওই বইয়ের একটি আলোচনার বিষয়ের নাম, প্রথম ছবিতে মার্ক করা আছে।
২) "কৃষ্ণ কা প্রিয় পত্নী সত্যভামা নে কাহা" - এখানে কৃষ্ণের আরেক পত্নী সত্যভামার উদ্ধৃতি তুলে ধরা হয়েছে, দ্বিতীয় ছবিতে মার্ক করে দেওয়া আছে।
** স্পষ্টতই এখানে শ্রীকৃষ্ণের দুইজন পত্নীকে স্বীকার করেছে। অর্থাৎ, অগ্নিবীরের তৈরি শ্রীকৃষ্ণের এক পত্নী বিষয়ক পোস্টার তাদের মান্য আচার্যের গ্রন্থ দ্বারাই খণ্ডিত হলো। তবে এবার কিছু লোক হয়তো বলবে যে উপরের ছবিগুলো ব্রহ্মমুনির লিখিত বই থেকে নেওয়া তার প্রমাণ কি? সেকারণে আমি উক্ত বইয়ের প্রথম পৃষ্ঠা যুক্ত করে দিচ্ছি -
যারা এটা পেয়েও সন্তুষ্ট নন তারা পেজে যোগাযোগ করবেন, বইয়ের পিডিএফ ফাইল দিয়ে দেওয়া হবে।
>>> তবে বলে রাখা ভালো তাদের আচার্য্যও ঠিক বলেন নি। কারণ মহাপুরাণের অন্তর্গত ব্রহ্মাণ্ড পুরাণ অনুযায়ী রাধা ও কৃষ্ণের বিবাহের বর্ণনা রয়েছে। আর ছান্দোগ্য উপনিষদ অনুযায়ী ইতিহাস ও পুরাণ হচ্ছে পঞ্চম বেদ। <<<
আমাদের আজকের আলোচনার বিষয় যেহেতু এগুলো নয় তাই আমি এগুলো নিয়ে বিস্তারিত ভাবে কিছু বলবো না (আমাদের ইউটিউব চ্যানেলে পঞ্চম বেদ ইতিহাস পুরাণের প্রমাণ ও ব্যাখ্যা করে ভিডিও রয়েছে)।
★ এবার আপনাদের দেখাবো মহাভারতের উক্ত শ্লোকে মূলত কি বলা রয়েছে -
 |
হরিদাস সিদ্ধান্তবাগীশ কৃত নীলকণ্ঠটীকা সম্বলিত মহাভারত |
তাদের ব্যবহৃত শ্লোকটি হচ্ছে উদ্যোগ পর্বের ১০৮ তম অধ্যায়ের ১৭ তম শ্লোক। এই শ্লোকটিও তারা পূর্বের গুলো না পড়েই নিজেদের স্বার্থ পূরণের উদ্দেশ্যে প্রচার করে। উপরের ছবি থেকে সকলে দেখে নিবেন এখানে মূলত দিবোদাসের একটি কাহিনী বর্ণনা করতে গিয়ে কে কিভাবে রমণ করে সেটা বলা হয়েছে - ১০৮ অধ্যায়ের ৮ থেকে ১৭ নং শ্লোকের মাধ্যমে (মানে একাধিক পত্নী থাকলেও কোনো একজনের সঙ্গে রমণের বিষয় উদাহরণ হিসেবে বর্ণিত)। ৭ নং ও তার পূর্বের শ্লোকগুলো কেউ পড়লে বুঝবেন যে এখানের মূল কাহিনী কি নিয়ে।
এখানে আরেকটি বিষয় হচ্ছে সনাতন ধর্মে সুনির্দিষ্ট কারণে একাধিক পতি-পত্নী গ্রহণ করা যায়। যেমন - দশরথের তিনজন পত্নী ছিলো, দ্রৌপদীর পাঁচজন পতি ছিলো আর এসবের নির্দিষ্ট কারণ রয়েছে। সেইসকল কারণ ছাড়া একাধিক বিবাহ অবশ্যই নিষিদ্ধ। উপরের মহাভারত থেকে দেওয়া ছবিতে ঋষি কশ্যপ এর একজন স্ত্রীর সাথে রমণ করার বিষয়েও রয়েছে । ঋষি কশ্যপেরও কিন্তু একাধিক পত্নী ছিলো। সেটার প্রমাণ বিষ্ণু পুরাণ থেকে দেখানো হলো -
বিষ্ণু মহাপুরাণ - ১ম খণ্ড - ১৫ নং অধ্যায়
★ শাস্ত্র অনুযায়ী শ্রীকৃষ্ণের ১৬ সহস্র পত্নী। মহাভারতে এবং বিস্তারিতভাবে বিষ্ণু ভাগবতে এই ১৬ সহস্র কন্যাকে বিবাহ করার বিষয় বিস্তারিত আছে। আর্য সমাজ ও অপপ্রচারকারীদের কারোর কারোর মত অনুযায়ী শ্রীকৃষ্ণের শুধু ৮ জন পত্নী এবং মহাভারতে ১৬ সহস্র পত্নীর বিষয়ে নেই। তাই এবার মহাভারত থেকে দেখাবো যে তাদের দাবি কতটুক সত্য!
মহাভারত থেকে ছবিসহ রেফারেন্স দেওয়া হলো শ্রীকৃষ্ণের ষোলো সহস্র পত্নীর বিষয়ে -
 |
অনুশাসন পর্ব - অধ্যায় ১৪/৭
|
 |
মৌসল পর্ব - ৭/৮৫
»»»★««« কিছু অপপ্রচারকারী এখন বলবে, এগুলো প্রক্ষিপ্ত তাই বোরি (BORI) ক্রিটিকাল এডিশন থেকে শ্রীকৃষ্ণের ষোলো সহস্র পত্নীর বিষয়ে দেখাবো - Vishnu Parva - Chepter - 88 (বিষ্ণু পর্ব, অধ্যায় ৮৮, বোরি ক্রিটিকাল এডিশন) |
এখানে উল্লেখিত আছে, হৃষিকেশ (উপরে মধুসূদন অর্থাৎ কৃষ্ণকে ইঙ্গিত করছে) ষোলো হাজার পত্নীকে একই সাথে বিবাহ করেন। আশা করি ক্রিটিকাল এডিশনকে কেউ অস্বীকার করবে না!
★★ এবার অনেকের মনে প্রশ্ন জাগবে যে শ্রীকৃষ্ণ কেনো ষোলো হাজার কন্যাকে বিয়ে করেন? এটা কি সনাতন ধর্মের আদর্শ?
প্রথমত, কৃষ্ণ হচ্ছেন স্বয়ং ঈশ্বরের পূর্ণ অবতার । দ্বিতীয়ত, উনি ঈশ্বর না হলে একই সাথে ষোলো হাজার পত্নীকে বিবাহ করতে পারতেন না। তৃতীয়ত, ওই ষোলো হাজার কন্যা একজন অসুরের বন্দী ছিলেন।
দ্বিতীয় কারণটির প্রমাণ উপরের ক্রিটিকাল থেকে দেওয়া ছবিতে রয়েছে। আর দ্বিতীয় কারণটি সত্য হলে প্রথমটিও সত্য। এবার তৃতীয় কারণটি ও সেই সাথে দ্বিতীয়টির কিছু প্রমাণ বিষ্ণু ভাগবত থেকে দেখাবো আর সংশ্লিষ্ট আরো কিছু দেখানো হবে -
সেই ১৬০০০ রাজকন্যা নিজের ইচ্ছা অনুযায়ীই কৃষ্ণকে নিজেদের পতি হিসেবে মন থেকেই বরণ করেন।
*সেই রাজকুমারীদের প্রত্যেকের মনে পৃথক পৃথক ভাবে এই একই চিন্তা এল – এই শ্রীকৃষ্ণই আমার পতি। বিধাতা যেন আমার এই অভিলাষ পূর্ণ করেন। এইভাবে তাঁরা অনুরাগ প্রেরিত হয়ে নিজেদের শ্রীভগবানের পাদপদ্মে সমর্পণ করলেন।
(<বিষ্ণু> ভাগবত মহাপুরাণ - ১০/৫৯/৩৫)
শ্রীমদ্ভগবদগীতা চতুর্থ অধ্যায় ১১ নং শ্লোক অনুযায়ী ঈশ্বরকে যেভাবে ভজনা করা হয়, ঈশ্বর সেভাবেই সেভাবেই সন্তুষ্ট করেন। তাই ১৬ হাজার কন্যার মনস্কামনা পূর্ণ করতেই ভগবান শ্রীকৃষ্ণ তাদের বিবাহ করেন। তাছাড়া উনিই তাদেরকে ভৌমাসুরের হাত থেকে রক্ষা করে নারীর সম্মান রক্ষা করার শিক্ষা আমাদের প্রদান করেন। এখানে যারা শ্রীকৃষ্ণকে এই শিক্ষা প্রদানের জন্য খারাপ চরিত্রের মনে করেন তারা নিশ্চয়ই অসুর মনোভাবাপন্ন!
উনি তো সেই কন্যাদের মহলে একইসাথে উপস্থিত থেকেছেন এবং একই সাথে, একই লগ্নে ১৬ সহস্র কন্যাকে বিবাহ করেছেন - যা শুধুমাত্র ঈশ্বরের দ্বারাই সম্ভব। বিষ্ণু ভাগবত থেকে এ সম্পর্কেও দেখে নেওয়া যাক -
'তদনন্তর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ একই শুভলগ্নে। বিভিন্ন ভবনে বিভিন্ন রূপ ধারণ করে শাস্ত্রোক্ত বিধি অনুসরণ করে ভৌমাসুরের অন্তঃপুর থেকে উদ্ধার করা রাজকন্যাদের পাণিগ্রহণ করলেন। সর্বশক্তিমান । অবিনাশী শ্রীভগবানের পক্ষে তা আশ্চর্যজনক ঘটনা কেন হবে?
হে পরীক্ষিৎ! শ্রীভগবানের পত্নীদের পৃথক পৃথক গৃহে এমন সকল দিব্যবস্তু ছিল যা জগতে অন্য কোথাও পাওয়া যায় না, প্রাচুর্যের কথা তো বলার নয়! সেই সকল গৃহে নিবাস করে অচিন্ত্যকর্ম অবিনাশী ভগবান শ্রীকৃষ্ণ নিজ আত্মানন্দে মগ্ন থেকে শ্রীলক্ষ্মীর অংশসম্ভূত সেই পত্নীদের সঙ্গে ঠিক তেমন ভাবেই বিহার করতেন যেমন কোনো সাধারণ মানুষ গৃহস্থাশ্রমে বসবাস করে গৃহস্থধর্মাচরণ করে।'
(<বিষ্ণু> ভাগবত মহাপুরাণ - ১০/৫৯/৪২-৪৩)
** এখানে কমলা রঙে হাইলাইট করা অংশে রয়েছে যে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের সেইসকল পত্নী শ্রী লক্ষ্মীর অংশ থেকেই উদ্ভূত। যেমন মাতা লক্ষ্মীর থেকে ১৬০০০ কন্যা উৎপন্ন হয়েছিলো তেমনি ভগবান বিষ্ণুর পূর্ণ অবতার তথা পরমেশ্বর শ্রীকৃষ্ণ আলাদা আলাদা ভাবে ১৬০০০ রূপ ধারণ করে একই লগ্নে সেই সকল কন্যাদের (যারা ভৌমাসুরের দ্বারা অপহৃত ছিলো) বিবাহ করেন।
'শ্রীশুকদেব বললেন—এইভাবে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ গৃহস্থদের পবিত্রতা প্রদানকারী শ্রেষ্ঠ ধর্মাচরণ করছিলেন। তিনি এক ও অদ্বিতীয় হওয়া সত্ত্বেও দেবর্ষি শ্রীনারদ তাঁকে তাঁর পত্নীর মহলে পৃথক পৃথক ভাবে দেখেছিলেন।'
(<বিষ্ণু> ভাগবত মহাপুরাণ - ১০/৬৯/৪১)
🟠 এটা প্রমাণিত হয়ে গেলো যে, শ্রীকৃষ্ণের একাধিক পত্নী ছিলো। মহাভারত, ক্রিটিকাল এডিশন, বেদের জ্ঞানকাণ্ড উপনিষদ অনুযায়ী পঞ্চম বেদ পুরাণ (ইতিহাসও পঞ্চম বেদ, এটা নিয়ে আমাদের পেজে ভিডিও প্রমাণ রয়েছে) থেকেই প্রমাণগুলো দেওয়া হয়েছে।
সংযুক্তি - তাছাড়াও শ্রীকৃষ্ণের আরো কিছু পত্নী ছিলেন। এমনকী বৈদিক উপনিষদ গোপালতাপনীর আচার্য্য ভাষ্যে রাধা রাণীর উল্লেখ ও ব্রহ্মাণ্ড মহাপুরাণ অনুযায়ী রাধা কৃষ্ণের বিবাহও হয়েছিলো। ঈশ্বর অবতার রূপে এসে বিভিন্ন কর্মের মাধ্যমে মূলত আমাদের শিক্ষা প্রদান করেন। পরম্পরানুগ আচার্য্যদের মতে পুরাণ হচ্ছে বেদের উপাঙ্গ। পুরাণ শাস্ত্রে - ইতিহাস, শিক্ষা মূলক ঘটনা, তন্ত্র, জ্যোতিষ, আয়ুর্বেদ, বেদের দিকে ধাবিত করার তথ্য থেকে শুরু করে বেদের কর্মকাণ্ড ও জ্ঞানকাণ্ডের বিষয়বস্তু পর্যন্ত রয়েছে।
★ সকল আলোচনার ভিত্তিতে বলা যায়, অন্য ধর্মের (যদিও সেগুলো মান্যতা অনুযায়ী শুধুই মত) ও সনাতন ধর্মের অপপ্রচারকারীদের এসব দাবি সম্পূর্ণ ভুল। তাদের থেকে সকলে দূরে থাকুন, সত্যের সন্ধান করুন, sss এর সাথে থাকুন 🙏🙏
জয় সনাতন 🙏
✍️ বৃহদ্রথ সান্যাল
(Senior researcher at RCSS of SSS)
সহায়তায় - SSS টীম (অর্ক বিশ্বাস, সাত্যকি দেব)
।ॐ।সত্যের সন্ধানে সনাতন।ॐ।
এগুলো সাধারণ সনাতনীদের পড়া উচিৎ !
উত্তরমুছুন